মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে প্রভাব পড়েছে, এই যুদ্ধের প্রভাব তার চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হয়ে দেখা দিচ্ছে। আমরা ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের কথাই বলছি। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা সম্প্রসারিত হয়েছে। লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীরা বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পালটা আক্রমণ শুরু করে। এই নিয়ে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এই রুটে বেড়ে গেছে অস্থিরতা। তার সঙ্গে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ইরানের হামলায় বহুপাক্ষিক যুদ্ধবিগ্রহের সূত্রপাত ঘটেছে।

এসব যুদ্ধের প্রভাবে আরেক দফায় বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর অভিঘাত সবার আগে যেখানে অনুভূত হবে, সেটি হলো মধ্যপ্রাচ্য। উল্লেখ্য, বহু বছর ধরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে বিভ্রমের আশ্রয় নিয়ে দেশবাসীকে শাসন করে এসেছেন, এই যুদ্ধ সেই বিভ্রম-বিভ্রান্তি ভেঙে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ফিলিস্তিনকে ইসরাইল কোনো রকম স্বীকৃতি না দিয়েই আরব দেশগুলোর সঙ্গে মসৃণভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সক্ষম হবে বলে নেতানিয়াহু যে আশা করেছিলেন, সেটি এখন আর সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্ন এখন এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গাজায় আক্রমণের ফল কী হবে না হবে, সেই প্রশ্নের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্য শান্তির বিষয়ে ইসরাইলকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। সৌদি আরব ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল, কিন্তু এখন সৌদি জনগণ ও মুসলিম বিশ্বের চাপের মুখে পড়ে সৌদি সরকার সম্ভবত এ বিষয়ে সামনে এগোতে ইসরাইলের কাছে ফিলিস্তিনের জন্য বড় ধরনের ছাড় দাবি করবে।

করোনার সময় দীর্ঘ লকডাউনে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পরিবহন চেইন ভেঙে যাওয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অর্থনীতি। এখন ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়বে এবং বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি আরো তীব্র রূপ ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির দিগন্তে কালো মেঘ ছেয়ে গেছে। যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি এরই মধ্যে দুর্বল প্রদ্ধিতে রয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। এটি জ্বালানি তেলের বাজারকে কতটা প্রভাবিত করে তা-ও দেখছি। করোনা-পরবর্তী যুদ্ধের কারণে আমরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছি। এতে অর্থনৈতিক বিভক্তিও শুরু হয়েছে। তেমন প্রেক্ষাপটে আরেকটি যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে পারে।’ আইএমএফের হিসাবে এ বছর বিশ্ব প্রবৃদ্ধি হবে ৩ শতাংশ। আগামী বছর তা আরো কমে হবে ২.৯ শতাংশ। 

আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়ারে-ওলিভিয়ার গোরিনকাস বলেছেন, ‘আইএমএফের গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ০.১৫ শতাংশ কমে এবং মূল্যস্ফীতি ০.৪ শতাংশ বাড়ে। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে আরো ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই অঞ্চলে সৌদি আরব, ইরান ও কাতারের মতো শীর্ষ জ্বালানি উত্পাদক দেশগুলোই শুধু অবস্থান করছে না, সেই সঙ্গে সুয়েজখালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথও রয়েছে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। থ্রি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ কারিম বাস্তা বলেন, ‘এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’ সিএনএন বিজনেসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাতে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়ানক অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপ ও বিশ্ব প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। তার মধ্যে নতুন করে এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক দেশগুলোর আন্তঃসংযোগে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা আরো বাড়াবে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা চালায় হামাস। এর পরদিনই এক লাফে তেলের দাম ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ শুরু হলে এবং স্থল অভিযানের ঘোষণা দিলে তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বাড়ে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকস জানায়, অতিসম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৭.৬৯ ডলার। এর পাশাপাশি লন্ডনের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৯০.৭৬ ডলার। সোমবার তেলের দাম বাড়েনি; বরং সামান্য কমেছে। এএনজেড ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক নোটে লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়লে তেলের দাম আরও বাড়বে।’ মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই সংকটে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, তেলের দাম বাড়লে রাশিয়ার সুবিধা, তারা সেখান থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারবে।

এই সপ্তাহের শুরু হতে না হতেই তেলের দাম ৫ ডলার বেড়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাত চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। ব্যাপারটি খুবই চ্যালেঞ্জিং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির জন্য। কারণ তেলের বাজার যে মাত্রায় ও গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে, অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবার বাজারের ক্ষেত্রে তেমন ঘটছে না। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে এই সংঘাতের যে স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদি প্রভাব পড়বে, তা রীতিমতো অনেক বড় একটা ভূমিকম্প।’ তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে স্বর্ণের দামও; আর এ দুই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে আরও শক্তিশালী হচ্ছে ডলার। এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়া শুরু করবে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জিহাদ আজৌর।

ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধে বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগ না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বিশ্বরাজনীতির সমীকরণে এর গুরুত্ব অনেক। প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকলেও বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। হামাস নিজেদের দাবিকে পুনরায় জাগ্রত করতে এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। হামাস হয়তো ভাবছে তাদের দাবি আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে আসছে আর সে কারণেই এই হামলা করেছে। এটা তাদের অত্যন্ত সিক্রেট একটা প্ল্যান ছিল। আমার কাছে সন্দেহ হচ্ছে, এর পেছনে অন্য কোনো পক্ষ থাকতে পারে।’ অভ্যন্তরীণ কোনো স্বার্থ থেকেও এ ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব। সুতরাং বাংলাদেশের একটু অপেক্ষা করতে হবে যে, এটি আসলেই গোয়েন্দা ব্যর্থতা, নাকি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। দুই পক্ষ যদি যুদ্ধবিরতি না করে, তাহলে এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের জন্য একটা যুদ্ধের দিকে যাবে।’

এই যুদ্ধের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সামগ্রিক সম্পর্ক রয়েছে, সেটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সেই জায়গায় যে কোনো পরিবর্তন আসলে খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ওপর পরোক্ষ চাপ বা পোলারাইজেশন ইফেক্ট আসবে। বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক না থাকলেও যুক্ত আছে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য আর তাই অর্থনীতির প্রভাব একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বরাজনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এই যুদ্ধ পরিবর্তিত হবে ভূরাজনৈতিক সমীকরণে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকলেও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে মত তাদের। বিশ্বরাজনীতিতে কারো পক্ষ না নিয়ে বাংলাদেশকে যুদ্ধবিরতির পক্ষে থাকতে হবে। বাংলাদেশকে সর্তকতার সঙ্গে এগোতে হবে। আরো একটি আশঙ্কার বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির পথ হলো মধ্যপ্রাচ্য। আর মধ্যপ্রাচ্যে যদি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও বিশেষত গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে তার মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। গ্রহণ করতে হবে বিকল্প ব্যবস্থা, যাতে ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল না হয়।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

ইত্তেফাক/এমএএম