সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ন্যায়নিষ্ঠ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান জরুরি

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

শ্রমশিল্পে ‘থ্রেস হোল্ড’ হ্রাসের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সহিত যুক্তরাষ্ট্র পার্টনার হিসাবে কাজ করিতে চাহে। এই কথা গত রবিবার জানাইয়াছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি আরো বলিয়াছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন, ইহা তাহাদের নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। ইহা বাংলাদেশ সরকার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের নিকটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, এই বার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়টি নিজের হাতেই রাখিয়াছেন।

উল্লেখ থাকে যে, এইখানে ‘থ্রেস হোল্ড’ হইল ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রমিকদের স্বাক্ষরের হার। ইহা কমাইবার ব্যাপারে নানান মতপার্থক্য রহিয়াছে। এই ব্যাপারে ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবরে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে জানাইয়াছে, শ্রমিকদের সম্মতি বা স্বাক্ষর লইবার হার পর্যায়ক্রমে কমাইয়া ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া সহজ করা হইবে। বর্তমানে থ্রেস হোল্ড ১৫ শতাংশে নামাইয়া আনা হইয়াছে। সেইখানেও একটা শর্ত রহিয়াছে—ইহা কেবল প্রযোজ্য হইবে যেই সকল কারখানায় ৩ হাজার বা উহার অধিক শ্রমিক রহিয়াছে। সেই ব্যাপারে আলোচনা হইতে পারে বলিয়া জানাইয়াছেন আইনমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্র মূলত চাহিতেছে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে থ্রেস হোল্ড তথা শ্রমিকদের সইয়ের হার ১০ শতাংশে নামাইয়া আনিতে।

ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়টি শ্রমবিশ্বে বিভিন্ন সময়ে নানান সংস্কারের ভিতর দিয়া গিয়াছে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়াটিকে শ্রম অধিকারের অঙ্গ হিসাবে দেখা হইলেও মনে করা হয়, ইহার সুষ্ঠু ও সদ্ব্যবহার শ্রম ও মালিক—উভয় পক্ষের জন্যই কল্যাণকর। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় উনিশ শতকে। সেই সময় গ্রেট ব্রিটেন, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম অধিকারের অংশ হিসাবে ট্রেড ইউনিয়নের প্রচলন ঘটে। ১৮৭১ সালে ব্রিটেনে ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট ইহার আইনি ভিত্তি তৈরি করে। সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও শ্রম অধিকার লইয়া নানান আন্দোলনের ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬৬ সালে ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন (এনএলইউ) গঠিত হয়, যাহা আমেরিকান শ্রম ইউনিয়নগুলির একটি ফেডারেশন তৈরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা বলা যায়। ইহার পর ১৮৮৬ সালে দক্ষ শ্রমিকদের বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার (এএফএল) প্রতিষ্ঠা করে, যাহা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি বৃহত্ আকারের শ্রম আন্দোলনের সূচনা করে। এইভাবে নানান ঘটনা পরম্পরায় শ্রম অধিকারকে আজিকার যুগে বিবেচনায় করা হয় মালিক-শ্রমিকের যুগবদ্ধ অধিকার হিসাবে। এই জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে ২৩-২৫ ধারায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং তাহাতে যোগদান করিবার অধিকার প্রদান করা হইয়াছে। আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ ধারা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করিবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ ১৯৭২ সালেই আইএলওর সদস্যপদ গ্রহণ করে।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, শ্রমিকপক্ষ ভালো না থাকিলে যেমন শিল্পকারখানার নিরন্তর উন্নতি সম্ভব নহে, তেমনি মালিকপক্ষ বিপন্ন হইলে তাহা শ্রমিকদেরও বিপন্নতার কারণ হইবে। এইখানেই পরিচয় দিতে হইবে ভারসাম্যের। প্রকৃতপক্ষে, উভয় পক্ষই একে অপরের পরিপূরক। মালিক তথা উদ্যোক্তার মাধ্যমে যেমন একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠে, তেমনি তাহার উন্নতি ও কলেবর বৃদ্ধি পায় শ্রমিকের অবদানের মাধ্যমে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক—এই দুইয়ের যে কোনো একটি ব্যতীত শিল্পকারখানা গড়া সম্ভব নহে। সুতরাং একটি ন্যায়নিষ্ঠ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ব্যতীত কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান টেকসই হইতে পারে না। সেই ন্যায়নিষ্ঠ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই সকল পক্ষের কাম্য।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন