সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের উন্নয়ন প্রয়োজন

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেই মানের শিক্ষার দরকার, সেই শিক্ষার পথে আমরা কতটুকু অগ্রসর হইয়াছি ও হইতেছি, তাহার মূল্যায়ন ও পর্যালোচনায় প্রায়ই নেতিবাচক কথাবার্তা শুনিতে পাওয়া যায়। ইহার এক নম্বর কারণ গুণমানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে না পারা। বাস্তবিক অর্থেই আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার শিকার। জ্ঞানার্জনের নিমিত্তে অর্থ ব্যয়কে উন্নত বিশ্বে ‘সর্বোত্তম বিনিয়োগ’ হিসাবে বিবচেনা করা হইলেও এই ক্ষেত্রে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রহিয়াছে। ফলে অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশ, ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ ‘অত্যন্ত নাজুক’ অবস্থায় নিপতিত। শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, শিক্ষার পরিবেশ এবং পাঠদান হইতে শুরু করিয়া আবাসন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নানামুখী অব্যবস্থাপনার শিকার হইয়া ধুঁকিতেছে উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রায় পৌনে দুই শতাব্দী পূর্বে (১৮৪১ সালে) প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ। বিশেষত জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে শিক্ষাকার্যক্রম বিঘ্নিত হইতেছে মারাত্মকভাবে। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ ভবনের দেওয়ালেই দেখা দিয়াছে ফাটল। কোথাও কোথাও খসিয়া পড়িয়াছে ছাদের পলেস্তারা। কঙ্কালের ন্যায় বাহির হইয়া আসিয়াছে রড। অধিকাংশ রুমের দরজা-জানালার অবস্থা অতি নাজুক—পাল্লা খুলিয়া গিয়াছে কিংবা ঝুলিয়া পড়িবার উপক্রম। লোডশেডিং হইলে দিনের বেলায়ও সমগ্র ভবনে নামিয়া আসে ‘রাতের আঁধার’। সেইরূপ পরিস্থিতিতে ক্লাস-পরীক্ষা চালাইতে মোমবাতি জ্বালাইবার প্রয়োজন পড়ে।

স্নাতক পর্যায়ে চাহিদানুসারে শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, ব্যাবহারিকের সরঞ্জামাদি ও আবাসনের সুযোগ-সুবিধার প্রচণ্ড ঘাটতি লইয়া প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রহিয়াছে। তাহাদের বক্তব্য, অনেক বিভাগেই সেশন অনুযায়ী পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবসুবিধা নাই। ফলে এক বর্ষের পরীক্ষা শুরু হইলে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষার সুযোগ থাকে না। একমাত্র লাইব্রেরিটিতেও নাই পর্যাপ্ত আসন। আবাসন সংকটও তীব্রতর হইয়া উঠিতেছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে ছাত্রাবাসের কক্ষগুলিতে থাকিতে হয় গাদাগাদি করিয়া। ক্যাফেটেরিয়া ও ডাইনিংয়ের খাবারও অতি নিম্নমানের। এই সকল নিয়মিত অভিযোগের সহিত যোগ হইয়াছে নূতন সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাইবার পর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সিলেবাস-প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পান না। ফলাফল প্রকাশেও দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হইতেছে। উনিশ শতকে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবে সম্মুখ হইতে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়াছে যেই প্রতিষ্ঠান, সময়ের বিবর্তনে তাহার এহেন ম্লান অবস্থা আমাদেরকে ব্যথিত করে।

উপর্যুক্ত সমস্যাবলি সমাধানে যতদ্রুত সম্ভব কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ভবন সংস্কারের পাশাপাশি ছাত্রাবাসগুলি পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। ‘একটি মাস্টারপ্ল্যান’ করিয়া পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে অবকাঠামোগত সংকট দূর করিবার পরিকল্পনার কথা বলিয়াছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে উক্ত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত। এই জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদান করিতে হইবে।

মনে রাখা দরকার, দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঢাকা কলেজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রহিয়াছে। সুতরাং অবিলম্বে সংকট উত্তরণের মাধ্যমে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতীতের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিবে এবং ক্রমেই ইহার মান বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া আমরা কামনা করি। শিক্ষার মান বজায় রাখিতে এবং আরো সমৃদ্ধ অবস্থানে যাইতে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো আবাসন ব্যবস্থাসহ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করিবার ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সরকার অতিসত্বর উদ্যোগী হইবে বলিয়া আমরা আশা রাখি। সর্বোপরি, ঢাকা কলেজসহ দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কারপূর্বক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন