সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ অগ্রহণীয়

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩০

ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র কেন সৃষ্টি করা হইয়াছে সেই সম্পর্কে আমরা অনেকেই ওয়াকিফহাল; কিন্তু ইহা যেই জন্য প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে, সেই মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে ক্রমশ সরিয়া আসিতে দেখা যায়। ইহা খুবই দুঃখজনক। কেননা আমলাতন্ত্র নিরপেক্ষ নহে বলিয়া এই সকল দেশে অস্থিরতা লাগিয়াই থাকে। মূলত আমলাতন্ত্রের সৃষ্টি করা হইয়াছে, যাহাতে রাজনৈতিক দলগুলি যখন যাহা খুশি তাহা করিতে না পারে। প্রশাসনে বজায় থাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তথা ভারসাম্যতা। রাজনৈতিক দলসমূহের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাহারা এমপি-মন্ত্রী হইয়া রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ তাহাদের নির্বাচনি আসনে অধিক হারে লইয়া যাইতে চাহেন। ইহা যাহাতে না হয় বরং দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করা হয়, এই জন্য আমলাতন্ত্র রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন তথা আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে পালন করে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষায়ও তাহাদের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সর্বদা নিরপেক্ষভাবে ও নিয়মানুযায়ী দায়িত্ব পালন করিতে হয়। তাহাদের দলীয় নেতাকর্মীর মতো আচরণ বেমানান ও অপ্রত্যাশিত। তাহারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলীয় আনুগত্যের জন্য নহেন। এই কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হইতে শুরু করিয়া বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহে আমরা যাহা দেখিতে পাই তাহা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কোনো কোনো দেশে এমনভাবে সকল কিছু দলীয়করণ করা হয়, যাহাতে দল ও আমলাতন্ত্র একাকার হইয়া যায়। ইহা ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকিবার জন্য সুবিধাজনক বটে, তবে দেশ ও দশের জন্য অমঙ্গলজনক। ইহার জন্য নাগরিক অধিকারসমূহ রক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়ে।

উন্নয়নশীল দেশসমূহে আমলাতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করিতে না পারিবার মূল কারণ হইল বিভিন্ন সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিকশিত হইবার সুযোগ না দেওয়া, বরং তাহা সমূলে ধ্বংস করিবার পাঁয়তারা করা। খোদ এই সকল প্রতিষ্ঠানে যাহারা কাজ করেন, অনেক সময় তাহাদেরও চক্ষুলজ্জা বলিয়া কিছু থাকে না। ছোটকালে তাহাদের মায়েরা তাহাদের চক্ষুতে কাজল দিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না। তাহা না হইলে তাহারা চক্ষুলজ্জার মাথা খাইয়া কীভাবে এতটা নিচে নামিতে পারেন? রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভ তথা নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। যিনি বা যাহারা ক্ষমতায় থাকেন তাহাদের কথামতো যাহা খুশি তাহা করা যায় না। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, বিচার বিভাগ প্রভৃতি দলীয়করণ হয়, তাহা হইলে সেই দেশের সাধারণ মানুষ যাইবেন কোথায়? কেননা সবাই তো একই দল করেন না বা করিতে পারেন না। তখন যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিবে। কারণ এই অবস্থার তো বিকল্প নাই। বিকল্প কেবল গণ-আন্দোলন। সকল পথ রুদ্ধ হইলে তখন কেবল এই পথই খোলা থাকে। এই জন্য আমরা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে প্রায়শ অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা লক্ষ করিয়া থাকি।

এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বহু উন্নয়নশীল দেশে আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করিয়া ক্ষমতাসীনরা আজীবন ক্ষমতায় থাকিবার চেষ্টা অতীতে যেমন করিয়াছে, এখনো তেমনি করিয়া যাইতেছে। আজীবনই যদি ক্ষমতায় থাকিতে হইবে তাহা হইলে শুধু শুধু জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় করিয়া জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রচেষ্টা কেন? এই সকল দেশে ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর কঠিন ও জটিল হইয়া পড়িয়াছে। ইহাকে কেন্দ্র করিয়া যেই সকল ঘটনা ঘটিতেছে তাহা অগ্রহণযোগ্য, অসমর্থনযোগ্য ও অনেক ক্ষেত্রে হূদয়বিদারক। এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি রূপকথার অবতারণা করা যাইতে পারে। মাছেরা এক দিন দলবদ্ধ হইয়া দেবতার নিকট তাহাদের রাজা চাহিলেন। দেবতা এক কচ্ছপকে মনোনীত করিলেন তাহাদের জন্য; কিন্তু কচ্ছপ কেবল ঘুমায়। মাছেদের কল্যাণে তাহার কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। দেবতা এইবার পাঠাইলেন মাছরাঙা পাখিকে রাজা করিয়া; কিন্তু ইহার ফল হইল মারাত্মক। ইহার পর মাছেরা যখনই মাথা চাড়া দিয়া উঠে, তখনই মাছরাঙা তাহাদের ধরিয়া আস্তা খাইয়া ফালায়। এইভাবে মাথা তুলিলেই তাহারা নাই হইয়া যায়। তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশে এখন পরিস্থিতি এমনটাই দাঁড়াইয়া গিয়াছে।

এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার এই সকল হতভাগ্য দেশে জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে না পারাটাই বড় ব্যর্থতা। ফলে যেই পথ খোলা থাকে, আমরা চাই বা না চাই—বারংবার সেই পথেই যায় আমজনতা। সেই পথ অবলম্বন করাটা তাহাদের নিকট তখন হইয়া দাঁড়ায় সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন