আমরা কি যন্ত্র-মানবে রূপান্তরিত হচ্ছি?

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪, ০৪:৪৫

আমরা কি জানি আমাদের সব থেকে বড় এবং কাছের শত্রু কে? মানুষ নয়, সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটি সব থেকে কাছের শত্রু! হাতে যখন অ্যান্ড্রয়েড ফোন ছিল না, তখন ঘুম থেকে উঠলে একটি শিশু খেলাধুলো করত বা স্কুলে চলে যেত। এখন ঘুম থেকে উঠেই মোবাইলে হয়তো কার্টুন বা গেমস খেলে। একজন ছাত্র বা ছাত্রীর কথাই বলি, আগে হয়তো ঘুম থেকে উঠলে ফ্রেশ হয়ে বই খুলে পড়তে বসত, এখন ঘুম থেকে উঠে দেখে মোবাইলটা চার্জ হয়েছে, নাকি মাথার কাছে আছে। মোবাইলটা ধরেই কাঁথা বা কম্বলের নিচে বসে ফেসবুকে ঢুকে দেখবে কোন বন্ধু কী কমেন্ট দিয়েছে। কেউ সুন্দর বললে মন ভালো হয়ে যায়, কমেন্টে একটু খারাপ বললে বা লাভ রিয়েক্টের পরিবর্তে হা হা দিলেই ‘সেন্টি খেয়ে’ সারা দিন চলে যায়। কেউ বা প্রেমের সম্পর্কে জড়ালে বই না পড়ে মোবাইলের এসএমএস পড়তে পড়তে বিয়ে পাশ (!) করে ফেলে। আগে স্কুলে বা কলেজের ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে বসে গল্প, চায়ের আড্ডা দিতে দিতে বিকেল পার করে দিত। এখন একসঙ্গে হলে পাশে বসে ঠিকই, তবে বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে কথা না বলে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে। আড্ডা দেওয়া হয় তবে সবাই বোবা বেশে থাকে, আর ফানি কোনো কিছু দেখলেই খলখলিয়ে হেসে ওঠে। প্রতিটা ক্ষেত্রে মোবাইল আমাদের শত্রুর মতো ব্যবহার করে।

মোবাইল ফোন নামক শত্রুটি আমাদের তার কথা শুনতে বাধ্য করে। ঘুম থেকে উঠে, ফ্রেশ হওয়া থেকে শুরু করে খেতে গেলে, ওয়াশরুমে গেলে, হাঁটার সময়, বাস, রিকশা, লঞ্চ, ট্রাক, বিমান, রকেট, অফিস, ফসলের মাঠ, জলে, পাতালে প্রতিটা ক্ষেত্রে মোবাইল, মোবাইল, মোবাইল। এই যন্ত্রটি আমাকে, আপনাকে, আমাদের এমনভাবে বশ করে নিয়েছে, এমনভাবে কালা জাদু করেছে যে মোবাইল ফোন বিহীন আমি যেন শূন্য! এক মিনিট মোবাইল ছাড়া নিজেকে খালি খালি মনে হয়। আমাদের মুখ খুলতেও, মুখে কথা বলার শক্তি থাকতেও আমরা প্রতিটা মানুষ যেন বোবা মানব। আমাদের হাত আছে কিন্তু সেটা মোবাইল ব্যবহার করছে। আমাদের চোখ আছে কিন্তু সেটা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন দেখছে। আমাদের মুখ আছে সেটা মোবাইল ফোনে কথা বলছে। আমাদের কান আছে  সেটা মোবাইল ফোনে কথা শুনছে। পুরো দেহটাই মোবাইলের কন্ট্রোলে।

প্রতারণা, ছিনতাই, বাটপারি, ধোঁকা, মায়া, আবেগ, ভালোবাসা, কান্না, হাসি সবকিছু মোবাইল ফোন করে দিচ্ছে। চিঠি লিখে ভালোবাসা প্রকাশ হতো, অভিমান হলে ছলে-বলে-কৌশলে ভালোবাসার মানুষের অভিমান ভাঙাত। কিন্তু এখন এসএমএস দ্বারা কথা হয়, কিছু হলে ব্লক মেরে শেষ। নতুন কারো সঙ্গে উধাও—রাগ, অভিমান ভাঙানোর সুযোগটাই হয়ে ওঠে না। যতোই বলি মোবাইল থেকে দূরে সরে দাঁড়াব, কিন্তু মোবাইল তত বেশি তার থেকে মায়া বাড়িয়ে ফেলে। তাই এখন মানুষ নামক শব্দটা থাকলেও প্রতিটা মানুষ এখন যন্ত্রমানব। যত ভাবি ধরব না মোবাইল, কিছু সময় পার হতে না হতেই মোবাইল যেন বলে ‘ছুঁয়ে দেখ আমায়’। মোবাইলের বিষাক্ত ছোবলে পুরো দেহ বিষাক্ত হয়ে গেছে।

ধরব না, ধরব না যত বলি,

মোবাইল বলে আমায় রেখে

কোথায় পালিয়ে যাবি?—

যত সরবে আমার থেকে,

তত মায়া দেব তোমার হূদয়ে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

ইত্তেফাক/এএইচপি