হুতিদের হামলা অর্থনীতি নাড়িয়ে দিয়েছে

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:৪৫

লোহিতসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের সাম্প্রতিক হামলার কারণে সমুদ্রবাহিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধার মুখে পড়েছে। এর ফলে বেকায়দায় পড়েছে ওয়াশিংটনও। কারণ গ্লোবাল কমন্সে (সব জাতি রাষ্ট্রের স্বাধীন, নির্বিঘ্ন চলাচল ব্যবস্থাপনা) বাণিজ্য-সুরক্ষার প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে হুতিদের এই হামলা।

ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হচ্ছে লোহিতসাগর। এটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংক্ষিপ্ততম বাণিজ্যপথও। এই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে পালটা হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। হুতিদের রুখতে লোহিতসাগর অঞ্চলে ‘অপারেশন প্রোসপারিটি গার্ডিয়ান’ নামে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো।

লোহিতসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার ফলে বিশ্ববাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, জ্বালানি তেলের মূল্য প্রভাবিত হচ্ছে এতে করে। লোকসান গুনতে বাধ্য হচ্ছেন জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। যাত্রীবাহী ক্রুজ জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে চলতে শুরু করার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এই খাতের সাধারণ ব্যবসায়ীরাও। স্বভাবতই এসবের আঁচ লাগছে বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতির গায়ে।

শুধু বাণিজ্যিক লোকসান কিংবা নিরাপত্তাজনিত ক্ষেত্রে নয়, হুতিদের হামলায় লোহিতসাগরে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার ফলে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা দেখা দিতে পারে আরেকটি ক্ষেত্রে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হুতি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য কী? শিয়া ইসলামপন্থি হুতি বা আনসার আল্লাহ গোষ্ঠীর আসল উদ্দেশ্য মূলত ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা। ইরানের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। ধারণা করা হয়, ইরানি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ‘প্রক্সি গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করে হুতিরা।

প্রশ্ন হলো, হঠাত্ কেন লোহিতসাগরে চলাচলকারী জাহাজকে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিল হুতিরা? ঘটনার শুরু গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের দিকে। ইসরাইলে হামাস বাহিনীর অকস্মাত্ হামলা এবং এর জবাবে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর পালটা হামলা, তথা ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের সূত্র ধরে সক্রিয় হয়ে ওঠে হুতি যোদ্ধারা। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, ’২৩ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে হুতিরা লোহিতসাগরে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে পূর্ণ মাত্রায় হামলা শুরু করে।

এই হামলার কারণে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য কমে গেছে অনেকখানি। হুতিরা অবশ্য দাবি করে আসছে, ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর হামলার প্রতিবাদে এ হামলা চালানো হচ্ছে। যদিও এই হামলার কারণে ইসরাইল ও হামাসের সংঘাত আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

উদ্বেগের বিষয় হলো, হুতিদের হামলার ফলে লোহিতসাগর জাহাজ চলাচলের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠায় ক্রমবর্ধমানভাবে উত্তাপ বাড়ছে বিশ্ববাণিজ্যে। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে লোহিতসাগর অঞ্চল অন্যতম বাণিজ্যিক রুট হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছিল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে জ্বালানিপ্রবাহের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ভারতে জ্বালানি সরবরাহে সুয়েজ খাল হয়ে ওঠে ‘অন্যতম রুট’। এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে দৈনিক প্রায় ৮.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং তেলজাত পণ্য সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে, যা সমুদ্রে তেল বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ। হুতিদের হামলার কারণে এই বিপুল পরিমাণ তেল-বাণিজ্য হুমকির মুখে উপনীত।

এমন একটি অবস্থায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যে অভিযান পরিচালনা করছে, তা কতটুকু কাজে দিচ্ছে, তাই দেখার বিষয়। অপারেশন প্রোসপারিটি গার্ডিয়ানের আওতায় নৌসম্পদের প্রতিরক্ষায় ড্রোন, সারফেস-টু-শিপ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট আকারের যুদ্ধজাহাজ এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বটে। তবে এসবে কাজের কাজ কিছু হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। হুতিদের আক্রমণ তো বন্ধ হয়ইনি এবং এমনকি লোহিতসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পথের নিশ্চয়তা দেওয়াও সম্ভব হয়নি। গৃহীত পদক্ষেপ একেবারেই কাজ করছে না, এমনও নয়। সামুদ্রিক বাণিজ্য কোনোভাবেই ব্যাহত করা যাবে না—ওয়াশিংটন ও লন্ডনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অন্তত এমন বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।

সমুদ্রে চলাচলের স্বাধীনতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের নিরাপত্তার অন্যতম নিয়ামক। বিশ্ববাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ নির্ভর করে সমুদ্রপথের ওপর। তেল, কয়লা, গ্যাস বা পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথ বেশি উপযোগী। সম্ভবত এ কারণেই সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে হুতিরা।

সমুদ্রপথে জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর উপসাগরীয় অর্থনীতি গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই দাবির সপক্ষে একটি হিসাবের কথা বলতেই হয়। সৌদি আরব ও কাতারের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ এবং কুয়েতের জিডিপির ৫০ শতাংশ আসে হাইড্রোকার্বন রপ্তানির মাধ্যমে। অন্যদিকে, সমুদ্রপথে প্রধান তেল আমদানিকারক দেশের তালিকায় রয়েছে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশের নাম। অর্থাত্, সামুদ্রিক বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়মিতভাবে হামলার শিকারে পরিণত হলে অবস্থা কোন পর্যায়ে দাঁড়াবে, তা সহজে অনুমেয়। যদিও এক্ষেত্রে একটি ‘কিন্তু’ আছে!

হুতি গোষ্ঠী সম্ভবত কিছু দেশের সঙ্গে বিরোধিতায় জড়াতে চায় না। এ কারণে তারা বেছে বেছে জাহাজ আক্রমণ করছে! সপ্তাহখানেক আগে এক হুতি মুখপাত্রের রুশ নিউজ চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বিষয়টি কমবেশি পরিষ্কার হয়েছে। ঐ মুখপাত্র বলেছেন, ‘চীনা বা রাশিয়ান কার্গোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে না’। তবে অন্যান্য দেশের জাহাজগুলোতে যে হামলার আশঙ্কা বাড়ার ইঙ্গিত রয়েছে, তা মোটামুটি নিশ্চিত। বিশেষ করে, নতুন করে চার হুতি শীর্ষ নেতার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর হামলার আশঙ্কা বেড়ে গেছে অনেকখানি।

সমুদ্রে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলার কারণে জলবায়ুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, এবার আসি সেই কথায়। আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী একপ্রকার যুদ্ধ চলছে। কার্বন ডাইঅক্সাইড নেট-শূন্য করার মিশন নিয়ে কাজ চলছে। ঠিক এমন একটি অবস্থায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে, তথা জ্বালানি পরিবহনে নিযুক্ত জাহাজগুলোতে হামলা চালালে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে ‘ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশন’ ব্যাহত হবে মারাত্মকভাবে। অর্থাত্, ন্যাভিগেশনের স্বাধীনতা বা সামুদ্রিক বাণিজ্য নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি। এক কথায় বলতে গেলে, ন্যাভিগেশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে তা কেবল বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই অশনিসংকেত বয়ে আনবে না, বরং ২০৫০ সালের মধ্যে নেট-শূন্য নির্গমনে পৌঁছানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, তা-ও মুখ থুবড়ে পড়বে।

বিশ্ব বাণিজ্যে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে পারাটাই আজকের দিনে মূল চ্যালেঞ্জ। এই লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, এডেন উপসাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে এই ঘোষণা দেন। লোহিতসাগরে চলমান অচলাবস্থার মধ্যে নতুন হামলার ঘোষণা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য আদৌ কোনো ভালো সংবাদ নয়।

হুতিদের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য অবশ্য বলেছে, হুতিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর কোনো ইচ্ছে তাদের নেই। বরং তারা শুধু লোহিতসাগরের নৌপথের সুরক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। হুতিদের পক্ষ থেকেও এ ধরনের নানা বক্তব্য-বিবৃতি আসছে। তবে বাস্তবতা হলো, লোহিতসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা না গেলে বিশ্ববাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘অন্ধকারময় মুহূর্ত’ দেখতে হবে নিশ্চিতভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে গ্লোবাল এনার্জি সেন্টারের সহকারী পরিচালক ও সিনিয়র ফেলো আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এএইচপি