সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পাকিস্তানের নির্বাচন উন্নয়নশীল বিশ্বেরই চিত্র

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনীতিতে, বিশেষ করিয়া নির্বাচন পূর্বাপর যেই সকল কাণ্ডকারখানা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাতে এই কথা যে কাহারো মনে আসা স্বাভাবিক যে আদৌ এই সকল নির্বাচন কোনো অর্থ বহন করে কি না; আদৌ গণতন্ত্রের নামে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা করিয়া অর্থ অপচয়ের প্রয়োজন আছে কি না। ইহার অন্যতম উদাহরণ পাকিস্তান। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। গত ১৫ ডিসেম্বর নির্বাচনের তপশিলও ঘোষণা করা হইয়াছে। এই নির্বাচনে ইমরান খানকে আইনের মারপ্যাঁচে ফালাইয়া অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করা হইয়াছে। তাহার বিরুদ্ধে তোশাখানা মামলাসহ দেড় শতাধিক মামলা করা হইয়াছে। এবং বহুলশ্রুত তথ্য হইল, যেই ইমরান খানকে তথাকথিত নির্বাচনের মধ্য দিয়া ক্ষমতায় আনিয়াছিল দেশটির সেনাবাহিনী ও অন্যরা, সেই তাহারাই আবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করিয়া নতুন নির্বাচনের আয়োজন করিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইমরান খানকে এবং তার দলকে নির্বাচন হইতে দূরে সরাইয়া রাখিবার জন্য দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কোরেশির বিরুদ্ধেও অবৈধভাবে সরকারি ক্যাব্ল ব্যবহারসহ কয়েকটি মামলায় ফাঁসানো হইয়াছে। ইহাতেও ক্ষান্ত হন নাই ক্রীড়নকেরা। ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতাকর্মীরা যাহাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করিতে পারেন, সেই জন্য নির্বাচনের ব্যালট হইতে দলটির প্রতীক ক্রীকেট ব্যাটও তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। ইহার সহিত সমগ্র দেশে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান মামলা দায়ের চলিতেছে। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতেছে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ), যাহা পিএমএলএন বলিয়া পরিচিত, পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপি এবং মওলানা ফজলুর রহমানের জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলাম। ইমরান খানকে ক্ষমতাচ্যুত করিবার পর যেই সরকার প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছিল, তাহার প্রধানমন্ত্রী হইয়াছিলেন নওয়াজ শরিফের ছোট এবং পাঞ্জাবে সাবেক চিফ মিনিস্টার শেহবাজ শরিফ এবং এই সময়েই পিএমএলএন দলের প্রধান ব্যক্তি নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে যত মামলা ছিল তাহা তুলিয়া লওয়া হয়। শেহবাজ শরিফ সরকারের অংশীদার হইয়াছিল পিপিপি ও জমিয়ত-ই-উলেমা। অর্থাত্, বিরোধী দল বলিয়া আর কিছু ছিল না। এখন ইমরান খান ব্যতীত নির্বাচনে তাহারাই লম্ফঝম্ফ করিবে।  

বর্তমানে ইহা প্রায় সকলের কাছেই পরিষ্কার যে, ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের দলই ক্ষমতায় বসিবে। যাহাকে বলে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। যেই কারণে পাকিস্তানের এই নির্বাচনে জনগণের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হইতেছে না। ফলাফল যদি পূর্বেই নির্ধারিত হইয়া যায়, তাহা হইলে পরীক্ষা দিতে শিক্ষার্থীরা পুলকিত হয় না। ইহাই স্বাভাবিক। কেবল পিপিপির সহিত আসন ভাগবাঁটোয়ারা বাকি রহিল। এরকম পরিস্থিতিতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ থাকিয়া যায়। এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইতিহাসের সবচেয়ে মন্দ সময় কাটাইতেছে। এই ‘সাজানো-গোছানো’ নির্বাচন যদি বন্ধু ও সহায়তা প্রদানকারী রাষ্ট্রগুলি মানিয়া না লয়, তাহা হইলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ যে অনিশ্চিত হইয়া পড়িবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। গণতন্ত্রের ন্যূনতম চর্চা না থাকিলে একটি দেশ এই রকমের ভালনারেবল হইয়া পড়িতে পারে। এই রকম পরিস্থিতিতে উত্থান হয় একধরনের সুযোগসন্ধানীর, যাহারা দেশ, দেশের নির্বাচন, দেশের প্রশাসনসহ সকল কিছুকে কুক্ষিগত করিয়া ফালায়। চিত্রই বলি আর অভিশাপই বলি, এই চিত্র কেবল উন্নয়ন বিশ্বের কিছু দেশেই পরিলক্ষিত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে আমরা দেখিয়াছি, নির্বাচন লইয়া কোনো কাড়িয়া লইবার অভিযোগ উঠে না। তাই দেশটিতে পরাজিত দল নির্বাচনের ফলাফল বিনা বাক্যে মানিয়া লয়। যেই কারণে ভারতে বিদেশি শক্তির প্রশ্নটিও কখনো উঠে না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন