এই সংকট শুধুই যে বাংলাদেশে আঘাত হানবে, এমন নয়। বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোও একই রকম পরিস্থিতিতে পড়বে। তবে একটি ইতিবাচক খবর হলো, বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজগুলো এখন পর্যন্ত হুতিদের আক্রমণের টার্গেট হয়নি। হুতিরা বলে যে তারা কেবল ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে, তাই বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের পতাকা বহনকারী জাহাজের ঝুঁকি কম হতে পারে
নৌপথ হলো বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণ। প্রতি বছর প্রায় ১১ বিলিয়ন টন পণ্য জাহাজে পরিবহন করা হয়। যাতায়াত ও বাণিজ্যের জন্য স্থলপথ বা আকাশপথ যতই উন্নত হোক না কেন, আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্য, কাঁচামাল পরিবহন এবং সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য ও উত্পাদিত পণ্য আমদানি-রপ্তানি জলপথ ছাড?া সম্ভব হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে মোট রপ্তানি ও আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় ৮০ শতাংশ এবং মূল্যের ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ নৌপথে হয়ে থাকে। প্রধানত পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং কম খরচের কারণে নৌপথকে শত শত বছর ধরে বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি এই নিরাপদ পথটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। মানবসৃষ্ট সমস্যার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট এতে যুক্ত হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি বাজার আরো অস্থির হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব ইতিমধ্যে দুটি দেশের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিতসাগরে ইসরাইল-সংযুক্ত জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পালটা হামলার তীব্রতা বাড়ার পর সংকট আরো গভীর হয়েছে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় বাংলাদেশের মতো যে দেশগুলো ইউরোপে পণ্য পাঠানোর জন্য এই রুট ব্যবহার করে, তাদের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
লোহিতসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা সুয়েজখাল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পথ। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ সুয়েজখালের মধ্য দিয়ে হয়, যা বৈশ্বিক কনটেইনার ট্রাফিকের ৩০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। হোয়াইট হাউজের মতে, বৈশ্বিক শস্য বাণিজ্যের ৮ শতাংশ, সমুদ্রগামী তেলের ১২ শতাংশ এবং বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের ৮ শতাংশ লোহিতসাগর দিয়ে যায়। গত মাস থেকে হুতিদের হামলার পর শিপিং কোম্পানিগুলো এখন লোহিতসাগর থেকে শিপিং রুট আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপের পাশে সরিয়ে নিচ্ছে। ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম বেইন বলেছেন :‘নভেম্বরে প্রায় ৫ লাখ কনটেইনার সুয়েজ খাল দিয়ে গেলেও ডিসেম্বরে তা ৬০ শতাংশ কমে ২ লাখ হয়েছে।’ সাংহাই কনটেইনারাইজড ফ্রেইট ইনডেক্স (এসসিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে লোহিত সাগরে সংঘাতের কারণে প্রতিটি জাহাজকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১০ দিন ব্যয় করতে হবে। এতে করে প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারের দাম ২৫ হাজার ডলারের থেকে বেড়ে ৩০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় একদিকে সময় বৃদ্ধি, অন্যদিকে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তেল-গ্যাসের দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে।
বৈশ্বিক মালবাহী জাহাজের ভাড়া আবার বাড়ছে। শিল্প বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে লোহিতসাগরে নিরাপত্তা হুমকির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দাম দ্বিগুণ হতে পারে। ইতিমধ্যে বিশ্বের প্রধান প্রধান শিপিং জায়ান্টগুলো জানুয়ারি মাস থেকে প্রতি TEU কনটেইনারে ৳৭০০ থেকে ৳১,৫০০ পর্যন্ত অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি কোম্পানি CMA G‰M ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ সমস্ত এশিয়ান বন্দর থেকে সমস্ত ইউরোপীয় বন্দরে ১ জানুয়ারি থেকে ঞঊট প্রতি ৳৫০০ এর ‘পিক সিজন সারচার্জ’ (PSS) আরোপ করেছে। এই সিদ্ধান্তটি ইতিমধ্যেই পণ্য পরিবহনের খরচকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করা শুরু করেছে এবং যদি সংকট বাড়তে থাকে, তাহলে এটি আমদানিকৃত পণ্যের জন্য গ্রাহকদের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে, যা বিশ্বব্যপী মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে জ্বালানির মতো কাজ করবে।
লোহিতসাগরে নিরাপত্তা হুমকির কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ বড় জাহাজ কোম্পানি যেমন—Maersk, MSC, Hapag-Loyd, CMA G‰M, ZIM, ‰es ONE —বাধ্য হয়ে তাদের জাহাজগুলো আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপের পাশ দিয়ে যাতায়াত করাচ্ছে, যার ফলে অপারেশন খরচ এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় বাড়ছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের একটি ভালো অংশ জলপথ দিয়ে হওয়ায় বাংলাদেশও এই সংকট থেকে রেহাই পাবে না। ইইউ, ইউএস ইস্ট কোস্ট এবং কানাডাগামী বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি বোঝাই কনটেইনার লোহিতসাগর অতিক্রম করে। তাছাড়া রাশিয়া, ইউক্রেন, রোমানিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, ডাল ও সয়াবিনের মতো বিশেষ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্যও এই রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশ।
দীর্ঘায়িত লোহিতসাগর সংকট বাংলাদেশের রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বিলম্বিত করতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক খাত এই রুটের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। কারণ দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ কাপড় ইউরোপীয় দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। কনটেইনার ঘাটতি এবং পণ্য সরবরাহের সময় বাড়ার কারণে রপ্তানিকারকেরা সারা বিশ্বেই অর্ডার হারাচ্ছেন। বাংলাদেশের পোশাক খাতও রপ্তানি আদেশ হারাতে পারে। উচ্চ কনটেইনার ভাড়া এবং কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে? যাওয়ার কারণে উত্পাদন খরচ বাড়তে পারে। যেহেতু জাহাজগুলো আফ্রিকা হয়ে রি-রুট করছে এবং মালিকেরা ৳১০-৳১২ অতিরিক্ত দাম দাবি করছে, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশি রপ্তানিকারক এবং আমদানিকারকদেরও উচ্চ মালবাহী চার্জ দিতে হবে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ দিতে পারে, কারণ বর্ধিত খরচ বৈদেশিক মুদ্রায় বহন করতে হবে। শুধু তাই নয়, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ পাওয়া কঠিন হবে, যা সমগ্র ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে।
সাধারণত, বাংলাদেশি পণ্য নিয়ে শ্রীলঙ্কা, সিংগাপুর ও মালয়েশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর থেকে লোহিতসাগর হয়ে ইউরোপীয় গন্তব্যে পৌঁছাতে জাহাজগুলোর ৩০ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে। এখন থেকে কমপক্ষে আরো অতিরিক্ত ১০ দিন লাগবে। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত গার্মেন্টস সরবরাহকারীদের বহন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে পোশাক রপ্তানিকারকদের ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্ট বেছে নিতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে খরচ অনেক বেশি হবে। উদাহরণস্বরূপ, সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপীয় গন্তব্যে এক কিলোগ্রাম পণ্য স্থানান্তর করতে ৩০ ইউএস সেন্টের কম খরচ হয়, সেখানে বিমান মালবাহী পরিষেবা ব্যবহার করা হলে একই পরিমাণের জন্য খরচ ৩.৫০ ডলার বহন করতে হবে।
এই সংকট শুধুই যে বাংলাদেশে আঘাত হানবে, এমন নয়। বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোও একই রকম পরিস্থিতিতে পড়বে। তবে একটি ইতিবাচক খবর হলো, বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজগুলো এখন পর্যন্ত হুতিদের আক্রমণের টার্গেট হয়নি। হুতিরা বলে যে তারা কেবল ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে, তাই বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের পতাকা বহনকারী জাহাজের ঝুঁকি কম হতে পারে। তদুপরি, বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা বিভিন্ন রুট ব্যবহার করার কারণে সার ও জ্বালানির চালানের সময় কোনো প্রভাব পড়বে না। বাংলাদেশ মূলত কেপ অব গুড হোপ ও আরব সাগর দিয়ে সার আমদানি করে। তাই এ অবস্থায় শিপিংয়ের সময় বাড়বে না, কিন্তু মালবাহী চার্জ বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশর জন্য আরেকটি সুবিধা হলো, দেশটির পণ্য আমদানির খুব নগণ্য একটি অংশ লোহিতসাগর দিয়ে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে দেশের ৳৬৮.৪৫ বিলিয়ন আমদানির ২৬.১ শতাংশ চীন থেকে সরবরাহ করা হয়। ১৩.৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। পরবর্তী প্রধান সরবরাহকারীরা হলো মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কাতার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিংগাপুর, জাপান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ কোরিয়া। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, লোহিত সাগরের সংঘাতের কারণে আমদানির চেয়ে রপ্তানি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ বাংলাদেশ থেকে বেশির ভাগ রপ্তানি পণ্য ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যায়।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম শিপিং রুট লোহিতসাগর যেহেতু হুতি হামলা ও তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের পালটা হামলার কারণে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, তাই অচিরেই বিশ্বে আরো একটি সাপ্লাই চেইন সংকট দেখা দিতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অন্যান্য পণ্যের মূল্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে এবং ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাডিয়ে তুলবে, যা বিশ্বে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে দিতে পারে।
লেখক: লন্ডনভিত্তিক একটি কম্পানিতে কর্মরত এবং গবেষণায় নিয়োজিত
