সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

এই ভূতগ্রস্ততা দূর করিতে হইবে

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

কথিত আছে, ভূতের পা নাকি উলটা দিকে থাকে। ভূত সামনের দিকে আগাইতে চাহিলেও সে আসলে পিছনের দিকে চলিয়া যায়। বাংলাদেশও কি ভূতগ্রস্ত হইয়াছে? স্বাধীনতার পর ৫২টি বত্সর পার হইয়া গিয়াছে, অথচ একটি নিয়মনীতিঋদ্ধ আইনকানুন দ্বারা অনুশাসিত আধুনিক রাষ্ট্র হইয়া উঠিবার পথে বাংলাদেশ যেন বহু ক্ষেত্রেই পিছনের দিকে হাঁটিতেছে। গতকাল রবিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত দুইটি সংবাদ আমাদের এই কথাই মনে করাইয়া দেয়। একটি সংবাদে বলা হইয়াছে যে, কথিত কিছু শিল্পপতি রহিয়াছে যাহাদের কারখানা নাই, নাই ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরও (টিআইএন)। ইহার পরেও তাহারা শিল্পপতি। শিল্পপতি সাজিয়া তাহারা নানান ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন। বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য হইয়া তাহারা ভোট দিয়া নেতাও নির্বাচন করিতে চাহেন। নিজেদের ভোট বিক্রি করাই নাকি তাহাদের প্রধান কাজ। এই রকম ৪২৯টি কথিত পোশাক-কারখানার নাম প্রকাশিত হইয়াছে।

মাদকসংক্রান্ত আরেকটি সংবাদের আলোকে আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলিতে চাহি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখিতে এবং তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করিতে মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করিলেও বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবতা হইল, মাদক ব্যবসায় ক্ষমতাসীন দলেই অনেকে রহিয়াছেন। বলা ভালো, তাহারা ক্ষমতাসীন দলকে তাহাদের মাদক ব্যবসায়ের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। এই সকল মাদক ব্যবসায়ীর কোনো মিল-কলকারখানা ও ব্যবসা নাই, অথচ তাহারা শত শত কোটি টাকার মালিক। এমনো কাহারো কাহারো কথা জানা যায়, একসময় যাহাদের পরিবার অন্য লোকের ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনে চাকুরি করিত, অথচ দশক না ঘুরিতেই তাহারা এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। তাহাদের এই উত্থানের পিছনে এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করিবার শর্তে বলিয়া থাকেন যে, তাহাদের মূল ব্যবসা হইল—মাদক ব্যবসা। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকা তাহাদের ব্যাবসায়িক কৌশল। পরিতাপের বিষয় হইল, অবৈধভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে উপার্জিত এত বিপুল অর্থের প্রতি তাহাদের মায়া নাই। কারণ উহা কষ্টার্জিত ও বৈধ নহে। সেই কারণে অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থ তাহারা প্রতিটি ঘাটে ঘাটে বিলাইয়া যে কোনো কিছু নিজেদের আয়ত্তাধীন করিতে চাহে। তাহারা আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলা হয়, যে কোনো নূতন রাষ্ট্রের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম পুঁজি সংগ্রহ করাটা সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং কাজ। এই জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথম পুঁজি প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া থাকে; কিন্তু বাংলাদেশ তো স্বাধীন হইয়াছে অর্ধশতক বত্সর পূর্বে। এখনো কেন প্রশ্নবিদ্ধ পুঁজির প্রশ্রয় থাকিবে? ইহা নিয়মকানুন ও আইনের শাসনঋদ্ধ একটি রাষ্ট্রের জন্য ভূতের পা ভর দিয়া চলিবার মতো। এই ভূত একটি প্রতিশ্রুতিশীল রাষ্ট্রকে কখনো সামনের দিকে আগাইতে দিবে না। আমরা শিল্পোন্নত আধুনিক রাষ্ট্রের দিকে তাকাইলে আরো স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে পারি—কোন চোরাবালিতে আমরা এখনো আটকাইয়া রহিয়াছি। আধুনিক ইউরোপের দেশসমূহ হইল আইনের শাসনের স্বর্গোদ্যান। অথচ হাজার বত্সর পূর্বে তাহার কী ভয়ংকর দশাটাই না ছিল! যুক্তরাজ্যের লেখক ও রাজনীতিক টনি রবিনসনের ‘কিংস অ্যান্ড কুইন্স’ শিরোনামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রহিয়াছে, যেইখানে দেখানো হইয়াছে কী করিয়া আজকের ইংল্যান্ড ‘আইনকানুনের মধ্য দিয়া’ একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া উঠিয়াছে। সেইখানে তিনি লিখিয়াছেন, অষ্টম শতাব্দীতে ইংল্যান্ড ৯-১০টি ভাগে বিভক্ত ছিল, সেই সকল ভাগে শাসন করিত বিভিন্ন উপজাতির শীর্ষনেতারা। আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ তথা সুইডেন-নরওয়ে হইতে ভাইকিং জলদস্যুরা নর্থ সি পাড়ি দিয়া প্রায়শই বহুধাবিভক্ত ইংল্যান্ডে আক্রমণ চালাইত। অতঃপর ইংল্যান্ডের প্রথম সর্বজনস্বীকৃত রাজা আলফ্রেড দ্য গ্রেট ইংল্যান্ডকে একটি বিশেষ আইনের মধ্যে আনিলেন। বলা হইয়া থাকে মহামতি আলফ্রেড ‘সকলের জন্য সমান আইন’-এর মাধ্যমে তত্কালীন ইংল্যান্ডের জন্য একটি মহত্ ‘আইডিয়া’ আবিষ্কার করিলেন। অতঃপর, আইনের শাসন কাহাকে বলে, ক্রমশ তাহার ইতিহাস তৈরি হইতে থাকিল। সুতরাং বাংলাদেশকে একটি আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করিতে চাহিলে এই ভূতগ্রস্ততা দূর করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন