সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতিবাদের নূতন ভাষার বিকাশ অব্যাহত থাকুক

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

প্রায় ৫০০ বত্সর পূর্বে ইতালির শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মটি এতটাই বিখ্যাত যে, ইহাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার করিতে দেখা গিয়াছে বিভিন্ন সময়। সম্প্রতি, গত রবিবার ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মের দিকে সুপ ছুড়িয়াছেন দুই বিক্ষোভকারী। যদিও চিত্রকর্মটি বুলেট প্রুফ কাচের মধ্যে সুরক্ষিত থাকায় ছবিটির কোনো ক্ষতি হয় নাই। মোনালিসার উপর আক্রমণ নূতন নহে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে চিত্রকর্মটির উপর অ্যাসিড ছুড়িয়াছিলেন এক দর্শনার্থী। সেই সময় চিত্রকর্মটি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল। পরে চিত্রকর্মটিকে প্রদর্শনের জন্য কাচের সুরক্ষাবলয়ের ভিতরে রাখিবার ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৯ সাল হইতে সুরক্ষা আরো মজবুত করিয়া চিত্রকর্মটিকে বুলেট প্রুফ কাচ দিয়া সুরক্ষিত করা হয়। ইহার পরও ২০২২ সালে চিত্রকর্মটির দিকে কেক ছুড়িয়া মারেন এক ব্যক্তি। গত রবিবারের ঘটনায় জানা যাইতেছে, যাহারা মোনালিসা চিত্রকর্মের উপর সুপ ছুড়িয়াছেন, তাহারা স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করিবার দাবি জানাইতে এমন অভিনব প্রতিবাদ করিয়াছেন। তাহারা বলিতেছেন যে, ফ্রান্সের কৃষিব্যবস্থা রুগ্ণ অবস্থায় রহিয়াছে। ইতিপূর্বে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিগত কয়েক দিনে কৃষকদের বিক্ষোভ করিতে দেখা গিয়াছে।

আমরা দেখিয়াছি, যুগে যুগে মানুষের ক্ষোভ বা বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে অভিনব সকল প্রতিবাদের ভাষা প্রয়োগ করিয়াছে। মানববন্ধন ছিল একসময়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বব্যাপী সবচাইতে আকর্ষণীয়, গণতান্ত্রিক ও সভ্যতার প্রতীকী প্রতিবাদের ভাষা। এখানে কোনো শব্দ থাকে না, থাকে না সরব স্লোগান। নিঃশব্দ সচেতন মানুষ তাহার ন্যায়সংগত দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড বা ব্যানার হাতে লইয়া জনগণ ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে সারিবদ্ধভাবে নীরবে দাঁড়াইয়া থাকে। এইভাবে সমগ্র বিশ্বেই প্রতিবাদের বিচিত্র ভাষা সরব থাকিতে দেখা যায়। কিছুদিন পূর্বে ভারতের মহারাষ্ট্রে এক ব্যক্তি সরকারের দেওয়া জমি পাইলেও তাহার দলিল পান নাই। প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরিয়াও তাহার লাভ হয় নাই। শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদের জন্য অভিনব এক পথ লইয়াছিলেন সেই মহারাষ্ট্রের কৃষক। তিনি মাটিতে পুঁতিয়া দিয়াছিলেন নিজের শরীর। মাটির উপরে ছিল কেবল তাহার মুণ্ডখানি।

আমাদের দেশেও সরকারের বা কোনো ব্যক্তির গৃহীত কোনো কাজে দ্বিমত প্রকাশ করিতে গিয়া কখনো প্রতিবাদ রূপ লয় সহিংসতায়। কখনো অনশন পালন করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয় মৌন মিছিল। করা হয় অবস্থান ধর্মঘট, অর্থাত্ একটি স্থানে বসিয়া পড়া। আবার শৃঙ্খলিতভাবে ব্যানার লইয়াও দাঁড়াইয়া থাকিতেও দেখা যায়। এমনকি কখনো কখনো কাফনের কাপড় পরিধান করিয়া প্রতিবাদ জানানো হয়, যাহার অর্থ হইল সিদ্ধান্তটি পরিবর্তনে প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত। প্রত্যেক ধরনের প্রতিবাদেরই উদ্দেশ্য থাকে। তাহার মধ্যে প্রধান উদ্দেশ্য হইল, জনমত গঠন এবং সরকারকে বা যে বিষয়ে বা যাহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাহাকে সিদ্ধান্ত হইতে সরিয়া আসিতে বাধ্য করার চেষ্টা। ইহা ছাড়া আরো বিনম্র প্রতিবাদও দেখা যায়। যেমন—ছবি আঁকিয়া প্রতিবাদ, গ্রাফিতি আঁকিয়া কিংবা গণসংগীত, দেশাত্মবোধক অথবা সুনির্দিষ্ট কোনো গান পরিবেশন করিয়া প্রতিবাদ, পাহাড় বা উঁচু ভবনে উঠিয়া প্রতিবাদ। কয়েক বত্সর পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র একটি অভিনব প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত একটি পুরাতন কৃষ্ণচূড়া গাছ কাটিয়া ফেলিবার কারণে তাহারা কাটিয়া ফেলা গাছের একটি গুঁড়িকে সাদা কাপড়ে মুড়াইয়া মিছিল করে। অর্থাত্ তাহারা ইহাকে বৃক্ষ হত্যা বলিয়া বিবেচনা করে। ইহার সহিত ঐ গাছটি যেইখানে ছিল তাহার পার্শ্বের একটি নূতন কৃষ্ণচূড়ার চারা লাগাইয়া দিয়াছিল।

আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলন, সংগ্রাম, রাজনীতি আর জনজীবনকে ঘিরিয়া বিচিত্র সকল প্রতিবাদের উদাহরণ তৈরি হইয়াছে। প্রতিবাদের নূতন নূতন ভাষার বিকাশ অব্যাহত থাকুক। তবে প্রতিবাদ হইতে হইবে ন্যায্য ও জনমুখী। এবং উহা যেন কাহারো ক্ষতি না করে। বিচিত্র সকল ভাষায় ন্যায্য প্রতিবাদে উদ্ভাসিত হউক রাষ্ট্র-সমাজের অলিন্দ। দূর হউক যত অনিয়ম, অন্যায়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন