শীতকালের অসুখবিসুখ

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

শীতকালীন রোগবালাইয়ে সুস্থ থাকতে চাই বাড়তি সতর্কতা। এই সময়টাতে মানুষ তুলনামূলকভাবে একটু বেশিই অসুস্থ থাকে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই সময়টা বেশ জটিলতা তৈরি করে। ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে গেলে অনেকের ত্বকে র্যাশ, সোরিয়াসিস কিংবা ড্রাই একজিমার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাছাড়া শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, সিওপিডি অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, সিওপিডি-জাতীয় শ্বাসকষ্টের রোগগুলো শুধু শীতকালীন রোগ না হলেও শীতে এসব রোগের প্রকোপ কিছুটা বেড়ে যায়। মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও ম্যাজম্যাজ করা, দুর্বল লাগা ও ক্ষুধামন্দার পাশাপাশি হালকা জ্বরের প্রাদুর্ভাবও দেখা দেয়। তাই রোগবালাই রোধে নেওয়া দরকার কিছু প্রস্তুতি।

শীতে ত্বকের সমস্যা থেকে বাঁচতে ধরন অনুযায়ী ক্রিম, লোশন, পেট্রোলিয়াম জেলি, গ্লিসারিন, ময়েশ্চারাইজার ইত্যাদি ব্যবহার করুন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তৈলাক্ত ত্বকে অতিরিক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ঠিক হবে না। এতে ত্বকের সেরামগ্রন্থি থেকে নিঃসারণ বেড়ে ব্রন ও খুশকির সমস্যা দেখা দিতে পারে। খাদ্যতালিকায় রাখুন উপকারী ভিটামিন ‘সি’, ‘এ’ ইত্যাদি খাবার। বেশিক্ষণ রোদে থাকবেন না এবং কড়া আগুনে তাপও পোহাবেন না। শীতকালে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে মাঝে মাঝে মুখে পানির ঝাপটা দিন। অতিরিক্ত গরম পানি মুখের ত্বকের ফলিকলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে, যা ত্বককে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। গোসলের সময় পানিতে কয়েক ফোঁটা জোজোবা বা বাদামের তেল দিয়ে নিলে তা ত্বককে আর্দ্র ও মসৃণ করতে সহায়তা করে। গোসলের পর এবং প্রতিবার মুখ ধোয়ার পর ভেজা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার বা লোশন ব্যবহার করুন। কখনোই জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজানো উচিত নয়। কয়েক ফোঁটা অলিভ অয়েল মধুর সঙ্গে মিশিয়ে ঠোঁটে লাগালে ঠোঁট কখনোই ফেটে যাবে না।

সর্দি-কাশি প্রতিরোধে বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যা এবং রাতে সবাইকে শীতের পোশাক বা গরম জামাকাপড় পরে থাকা উচিত। শীতে ধূলিকণা, কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে। তাই এ সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। আর্থরাইটিস বা বাতের সমস্যা শীতের সময় বেড়ে যায়। মূলত বয়স্কদেরই এই সমস্যা হয় বেশি। এ ধরনের রোগীদের শীতের সময় চলাফেরা বা মুভমেন্ট কম হয় বলে ব্যথার প্রকোপ বেড়ে যায়। এজন্য ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে দেহের অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা কমিয়ে আনুন। একটানা অনেকক্ষণ বসে না থেকে যতটুকু সম্ভব ঘরেই হালকা মুভমেন্ট করুন। প্রয়োজনে গরম পানি ব্যবহার করুন। গরম সেঁক দিন বা ফিজিওথেরাপি নিন।

শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে আপনার হাতগুলো জীবাণুমুক্ত করে নিন এবং অন্যদেরও সেটি করার পরামর্শ দিন। জীবাণুগুলো থেকে দূরে রাখতে, আপনার শিশুকে জনবহুল জায়গায়গুলোতে নিয়ে যাওয়া এড়ান এবং ঠান্ডা লেগে থাকা ব্যক্তিদের থেকে তাকে দূরে রাখুন। যে বাচ্চা পূর্ণ ৩৭ সপ্তাহ মাতৃগর্ভে কাটিয়ে জন্ম নিয়েছে, তার ক্ষেত্রে জটিলতা কম। কিন্তু সময়ের আগেই জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। শীতের মাত্রা তীব্র হয়ে গেলে হাইপোথার্মিয়া হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের এটি হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। হাইপোথার্মিয়া হলে শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসে। শরীরে তাপ উত্পাদন কম হওয়ায় হাত-পা কুঁকড়ে যায়, এমনকি শরীর অবশ হয়ে আসতে থাকে। এজন্য পর্যাপ্ত গরম কাপড়সহ হাতমোজা, পায়ের মোজা পরতে হবে। গরম পানি পান ও গরম খাবার খেতে হবে। রুম গরম রাখতে আগে থেকেই রুম হিটারের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এই রোগের যে কোনো লক্ষণ যেমন—শরীরে কাঁপুনি, অসারতা, আড়ষ্টতা, দিগ্ভ্রান্ততা, অ্যামনেশিয়া ইত্যাদি দেখামাত্র জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

গলাব্যথা, স্বরভঙ্গ, কণ্ঠনালির নানা সমস্যাসহ টনসিলের প্রদাহ বা টনসিলাইটিস বেশি হয় শীতে। সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে এই রোগ বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে ওষুধ সেবনের খুব একটা দরকার পড়ে না। টনসিলাইটিসের সমস্যা যাঁদের রয়েছে, তাঁরা লবণ মেশানো হালকা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করলে আরাম পাবেন।  কানে ব্যথা হলে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিত্সা নিন। তীব্র শীতে ঠান্ডা আবহাওয়ায় রক্তচাপ বেড়ে গেলে হূদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এতে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ঘটতে পারে, বিশেষ করে ভোরের দিকে। যাদের উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি একটু বেশি। এজন্য শোবার ঘরের পরিবেশ যথাসম্ভব উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা করা এবং শীতে কুয়াশার মধ্যে নয়, বরং একটু রোদ উঠলেই বাইরে বের হয়ে হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করা ভালো। সালাদ, সিজনাল ফলমূল বেশি খাওয়া উচিত। শীতের সময় রাত জাগা ক্ষতিকর। তাই দ্রুত শুয়ে পড়ার অভ্যাস করুন।

শীতকালে জলবায়ু রুক্ষ ও শুষ্ক হওয়ার কারণে আমাদের ত্বক ফাটে। তাই ত্বক ভালো রাখতে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত। বিভিন্ন কোমল পানীয় পরিহার করে ভেষজ চা পান করুন। বেশি পরিমাণে ফাইবারযুক্ত খাবার খান। এ সময় মিষ্টি খাবার যেমন—কেক, সিরিয়াল, বাজারজাত জুস, কোমল পানীয়, উচ্চমাত্রার চিনি দিয়ে তৈরি খাবার বেশি খেলে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। শীতের সময় সব ধরনের ভাজা ও হিস্টামিনযুক্ত খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত।

লেখক: ইন্টার্ন শিক্ষার্থী,  ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

ইত্তেফাক/এমএএম