সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা ব্যতীত কীসের আমলাতন্ত্র?

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু রাষ্ট্রের অন্তঃস্থ সমস্যা লইয়া গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিলে যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের মাথা ঘুরিবে। এই সকল দেশে এমন কিছু সমস্যা জাঁকিয়া বসিয়াছে, যাহা না যায় হজম করা, না যায় উগরাইয়া ফেলা। এই জাতীয় সমস্যার জন্য উন্নয়নশীলের বিশ্বের অন্তঃস্থ বিভক্তিও দূর হয় না সহজে। ইহার একটি হইল আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতার সমস্যা। ব্রিটিশরা তাহাদের বিশ্বস্ত আমলাদের দিয়াই পৃথিবীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল শাসন করিতে পারিয়াছিল। কারণ, তাহারা ছিল অত্যন্ত দক্ষ ও নিরপেক্ষ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারে ঘুুরিয়াফিরিয়া ভিন্ন ভিন্ন দল ক্ষমতায় থাকিবে। ইহাই স্বাভাবিক। রাজনীতিবিদরা কখনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করিতেও পারেন, তাহারা ক্ষমতায় স্থায়ীও নহেন। এই জন্য একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়, এমন একটি স্থায়ী দক্ষ ও প্রশাসনের যাহারা দলনিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করিবে। অর্থাত্ আমলারা হইবেন পক্ষপাতহীন। বর্তমানে আমরা যেই অর্থে আমলাতন্ত্র বুঝিয়া থাকি তাহার বিকাশ শুরু হইয়াছে, উনিশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় দেশগুলির রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে। আধুনিক আমলাতন্ত্রের জনক জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার। তিনি উনিশ শতকে তাহার ‘এসেজ ইন সোসিওলোজি’ গ্রন্থে আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বলিয়াছেন, আমলাতন্ত্র হইল প্রশাসনের একটি ব্যবস্থা, যাহার বৈশিষ্ট্য দক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব এবং মানবিকতার ঊর্ধ্বে কাজ করা। স্পষ্টতই এইখানে দুইটি বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে আমলারা নাগরিকদের সেবা করিবেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্রপরিচালনায় সহযোগিতা করিবেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশের রাজনীতিও ঠিক হইল না, আমলারাও ঠিক নিরপেক্ষ হইল না। যাহারা যখন ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়, টাকাপয়সায় কিংবা রাজনীতিতে; আমলারাও যেন সেই পক্ষের অর্থের কিংবা ক্ষমতার দিকে ঝুঁকিয়া পড়েন। উন্নয়নশীল বিশ্বে দেখা যায় যে, যথেষ্ট ক্ষমতাবান ও ভালো বেতনভুক্ত হইয়াও প্রশাসনের অনেকে আরো অধিক ক্ষমতা ও অর্থের স্বাদ পাইতে নিরপেক্ষতা বিসর্জন দেন। ইংরাজিতে একটি প্রবাদ রহিয়াছে, যাহার অর্থ হইল—পৃথিবীতে কোনো ফ্রি লাঞ্চ নাই। কোথাও যদি বিনামূল্যেও কিছু দেওয়া হয়, উহার অবশ্যই নেপথ্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে। সুতরাং প্রশাসনের কেহ অন্য কাহারো নিকট ফ্রি সুবিধা লইলে, তাহাকেও যৌক্তিক মূল্যের সুবিধা প্রদান করিতে হয়। এখন, প্রশাসনের কর্মচারী-কর্মকর্তারা যদি পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, তাহা হইলে আমলাতন্ত্র সৃষ্টির মূল সূত্রটিই অমান্য করা হয়। কারণ নিরপেক্ষতাই আমলাতন্ত্রের মূল স্পিরিট। সুতরাং ইহার পরিপন্থি আচরণ ও কর্মকাণ্ড দিনের পর দিন চলিলে আজ হউক কাল হউক, এমনকি এক শত বত্সর পর হইলেও ইহার কুফল পাওয়া যাইবে। তবে আমলাতন্ত্রের বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা নিয়মকানুনের বাহিরে কখনোই নিজেকে বিকাইয়া দিবেন না। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র হইল হূিপণ্ডের মতো। যাহারা মনে করেন তাহারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে চেনেন, তাহারা আসলে হাতুড়ে ডাক্তারদের মতো। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতর কত ধরনের ফাংশন এবং অন্তঃস্থ শিরা-উপশিরার জালিকা রহিয়াছে, তাহা কল্পনার বাহিরে। সুতরাং রাষ্ট্রযন্ত্রে মধ্যকার বিপুল শিরা-উপশিরার কোনো জালে আটকাইয়া যাইতে পারে নিয়মের বাহিরে চলা পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দুঃখজনকভাবে, ব্রিটিশরা চলিয়া যাইবার পর উন্নয়নশীল বিশ্বে আজ অবধি কেহ এই সমস্যার দিকে নজর দেয় নাই, কেহ প্রশ্ন তোলে নাই। এমনকি আমলারা সম্ভবত তাহাদের কার্যবিধির পুস্তিকাটিও মনোযোগ দিয়া পড়িয়া দেখেন নাই।

কিন্তু নিয়ম তো মানিতেই হইবে। পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে দেখা গিয়াছে, আমলাতন্ত্র পক্ষপাতদুষ্ট হইলে প্রশাসন শুধু দুর্বল হইয়াই পড়ে না, জনস্বার্থও তাহাতে বিঘ্নিত হয়। দুর্বল হইয়া পড়ে আইনের শাসন। তখন ঈশান কোণে জমিতে শুরু করে বজ্রগর্ভ কৃষ্ণমেঘের ঘনঘটা। আর সেই দুর্যোগের ঘনঘটা ছড়াইয়া পড়িতে পারে অগ্নিকোণ, নৈঋতকোণ, বায়ুকোণসহ সমস্ত চরাচরে। এই সকল কারণেই নৈরাজ্য আসে, বিপ্লব সৃষ্টি হয় একটি জনপদে। সুতরাং নিয়ম মানিয়া চলাটা সকলের জন্যই মঙ্গলজনক।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন