ইরানের হামলার জবাবে বাইডেনের তিন বিকল্প পথ

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

জর্ডানে এক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান-সমর্থিত বাহিনীর গত রবিবারের (২৮ জানুয়ারি) ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং ৩০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনীতিবিদ প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন।

এই তালিকার প্রথমেই ছিলেন রিপাবলিকান দলের লিন্ডসে গ্রাহাম। তিনি টুইট করে বলেন, ‘ইরানকে জবাব দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। তাদের যথাযথ প্রতিদান দিতে হবে।’ গ্রাহামের সিনেট সহকর্মী জন কর্নিন আরো কড়া কথা বলেন। তিনি পারমাণবিক বোমার ইঙ্গিত দিয়ে এক্সে (টুইটার) লিখেছিলেন, ‘আমাদের টার্গেট এবার তেহরান।’ টন কটন বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে বাইডেন যদি সরাসরি ইরান আক্রমণ না করেন, তাহলে তিনি কাপুরুষ বলে বিবেচিত হবেন।’

বাইডেন প্রশাসন রবিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘মার্কিন গোয়েন্দারা ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে যে ড্রোন হামলাটি সিরিয়া ও ইরাকের “ইরান সমর্থিত বাহিনী” দ্বারা সংঘটিত হয়েছে।’ এ ব্যাপারে ইরান জানায়, এই স্ট্রাইকের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী এই অঞ্চলে ‘রেজিসট্যান্স গ্রুপ’ দ্বারা মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত সেখানকার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে থাকে। এখানে ইরানের কোনো হাত নেই।

কয়েক সপ্তাহ ধরে বাইডেন প্রশাসন ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান-সমর্থিত বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করার জন্য একটা সীমিত পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যারা অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬৫ বার মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করে। এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, তাদের আক্রমণের মাত্রা সীমিত রাখার উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত প্রতিরোধ করা, যেন সেটা গাজা স্ট্রিপ ছাড়িয়ে দক্ষিণ লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়াকে জড়িয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত না হয়।

বাইডেন বলেন, ‘গত চার বছরে এই অঞ্চলে মার্কিন সেনাসদস্যদের ওপর মারাত্মক হামলার কারণে ওয়াশিংটন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তারা ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া ঘাঁটিতে হামলার মাত্রা সীমিত রেখেছিল। কিন্তু এখন আর নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘গত রবিবার আমাদের জন্য একটা কঠিন দিন ছিল। ইরানের হামলায় এক ঘাঁটিতে আমরা তিন জন সাহসী সেনাকে হারিয়েছি। সঠিক সময়ে এর মোক্ষম জবাব দেওয়া হবে।’

বাইডেন এখানে কোন ধরনের পন্থা অবলম্বন করতে পারেন? মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এ ব্যাপারে একটা সামরিক পরিকল্পনা এঁকেছে। তারা তাদের সামনে তিনটা বিকল্প সম্ভাবনার রূপরেখা প্রদান করেছে :ইরানের অভ্যন্তরে গিয়ে আঘাত হানা, ঐ অঞ্চলে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করা অথবা কূটনৈতিক পন্থা অনুসরণ করা।

বিকল্প ১ :ইরানের অভ্যন্তরে হামলা

ইরাক ও সিরিয়া সীমান্তের কাছে জর্ডানের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত ‘টাওয়ার ২২’-এ রবিবারের ড্রোন হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাইডেনের সমালোচকেরা একমত হয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা যেন বাড়তে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য ইরানি প্রক্সিদের বিরুদ্ধে স্ট্রাইক সীমিত রাখার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন, সে কারণে ইরান মার্কিন ঘাঁটি আক্রমণের এমন সাহস করতে পেরেছে। কিছু সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক আকারে হামলা পরিচালনাই হতে পারে এর একমাত্র উপযুক্ত জবাব।

জন মিলার একজন অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল, যিনি একসময় পারস্য উপসাগরে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বলেন, ‘আমরাই নিজেদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছি, যেখানে ইরানের কার্যকলাপ দমন করার জন্য তাদের ওপর সরাসরি হামলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তারা লাল দাগ অতিক্রম করে ফেলেছে। এর জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

মিলার বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানের অভ্যন্তরে হামলা করা, যেটা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পাশাপাশি অন্য দেশে অস্ত্র পাঠনোর ক্ষমতাকে কমিয়ে দেবে। তিনি আরো বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, যেন তারা অবাধে তেল রপ্তানি করতে না পারে।

বিকল্প ২ :ইরানের সম্পদের বিরুদ্ধে হামলা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর প্রয়োজন আছে বলে সবাই বিশ্বাস করে না। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সন্ত্রাস দমনের জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক সমন্বয়কারী নাথান সেলস বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা দীর্ঘ ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে যে, একটা সময় ছিল, যখন ঐ অঞ্চলে উচ্চমূল্যের ইরানি সম্পদে আঘাত করে ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উসকানি রোধের চেষ্টা করেছে।

তিনি ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিসের’ কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে পারস্য উপসাগরে তেহরানের স্থাপিত মাইন বিস্ফোরিত হওয়ার কয়েক দিন পরেই রোনাল্ড রিগান প্রশাসন ইরানের জাহাজের ওপর আক্রমণ করেছিল। সেই সময় রিগান প্রশাসন ইরানি নৌবাহিনীকে ডুবিয়ে দিয়েছিল এবং এরপর ইরান বেশ কিছু সময়ের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল। নাথান সেলস মনে করেন, আবারও এমন কিছু করার সময় এসেছে।

বিকল্প ৩ :কূটনৈতিক পুনঃসংযোগ

২০১৮ সালে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এলেও ২০২০ সালে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক শক্তি অর্জন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। এমনকি সেই আলোচনা কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলেও গত অক্টোবরে হামাসের আক্রমণের আগ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন বিশ্বাস করত যে, ইসরাইল ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য একমাত্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই মধ্যপ্রাচ্যকে শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারবে। এবং যখন চীন ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতার মধ্যস্থতা করেছিল, তখন মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা চলমান মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও সেটাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

এই মুহূর্তে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল-হামাস বিরোধের অবসান ঘটাতে এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা হ্রাস করতে একটা কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। তারা এখন বাইডেন প্রশাসনকে লাল বোতাম থেকে এক ধাপ পিছিয়ে দরকষাকষির টেবিলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির’ এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট ডাস বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির জন্য আলোচনার টেবিলে বসার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটা বৈধ দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য চাপ দেওয়া উচিত এবং গাজা উপত্যকায় ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর শর্ত আরোপ করা উচিত, যেখানে ইতিমধ্যে ২৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বাইডেন যদি মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনকে সম্মান করেন, তাহলে সেটা প্রমাণ করার এখনই উপযুক্ত সময়।

লেখক: ফরেন পলিসির পেন্টাগন ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদক

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইত্তেফাক/এমএএম