রাবিতে হলের ছাদ ধস: ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দায়ী!

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২১:৩৪

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নির্মাণাধীন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান আবাসিক হলের অডিটরিয়ামের সাটারিংসহ ছাদ ধসের ঘটনায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনে’র অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। 

ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশ ও পর্দাকাণ্ডের বহুল আলোচিত ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ১০তলা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান আবাসিক হল এবং ২০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ কিভাবে পেয়েছে? তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে সাটারিংসহ ছাদ ধসই নয়, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনে’র বিরুদ্ধে শ্রমিক ও ছাত্র হত্যার অভিযোগ তুলেছেন বিশ^বিদ্যালয় শাখা সাতটি বাম সংগঠনের নেতারা। 

বুধবার (৩১ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে যৌথবিবৃতিতে ভবন ধস ও ছাত্র-শ্রমিক হতাহতের ঘটনায় ‘খুনি’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনে’র বিরুদ্ধ মামলা ও শাস্তির প্রদান এবং নির্মাণাধীন ভবন দুটির কাঠামোর স্থায়ীত্ব ও নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে নতুন ঠিকাদার দিয়ে ভবনের বাকী কাজ সম্পন্নের দাবি জানানো হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার (১ ফেব্রুয়ারি) ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মাদার বখশ হলের দক্ষিণে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান আবাসিক হলের শূলভবনের পাশেই একতলার অডিটরিয়ামের উপরে তোলা পূর্বপাশের বিম এখনো ঝুলে রয়েছে। পশ্চিম পাশে তৈরি ৫৬ ফুটের দু’টি বিমের রড ও খোয়া নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। 

ভেঙে পড়া সাটারিং সরানোতে নিয়োজিত শ্রমিক এবং রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রমিকরা জানান, ‘সোমবার (২৯ জানুয়ারি) সাটারিং ও বিমের ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়। মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) ভোর থেকে রড বিছিয়ে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়। তারাও কাচা বিমের উপর ছাদ ঢালাইয়ের কাজ আগে কখনো করেননি। তবে সাইট থেকে কাজটা এভাবেই করার নির্দেশনা ছিল।’
 
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, বিমের ঢালাই শেষ করার পর শক্ত হওয়ার জন্য সাধারণত ১০-১৫ দিন গ্যাপ (সময়) দিতে হয়। এসময়ে বিমে প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিতে হয়। কিন্তু সাটারিংসহ ধসে পড়া ভবনের বিমে এসব করা হয়নি।

উল্লেখ্য, বুধবার বিকালে ঘটনার কারণ সম্বলিত পৃথক প্রতিবেদন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মো. সুলতান উল ইসলামের কাছে জমা দিয়েছেন সাইট প্রকৌশলী, প্রধান প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য সাংবাদিকদের জানান, ‘নির্দেশনা মত সময়ে সংশ্লিষ্টরা প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে ঐ প্রতিবেদন তিনি দেখবেন না। সেগুলো সরাসরি তদন্ত কমিটিকে দিবেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক খোন্দকার শাহরিয়ার রহমান জানান, ‘তদন্ত চলমান থাকায় কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে বিম ঢালাইয়ের পর শক্ত হতে নির্দিষ্ট সময় দিতে হয়। এখানে যেটা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি।’ অনূরূপ কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ। তবে মতামতের জন্য রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে দু’টি ভবন নির্মাণ কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আলোচিত ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনে’র কর্মকর্তা হায়াত মাহমুদকে বৃহম্পতিবারও ক্যাম্পাসে পাওয়া যায়নি। 

ভবন ধসে শ্রমিক হতাহত অপ্রত্যাশিত 

এদিকে ভবন ধসের ঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহবায়ক ফুয়াদ রাতুল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি শাকিল হোসেন, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি রায়হান আলী, নাগরিক ছাত্র ঐক্যের সভাপতি মেহেদী হাসান, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের আহবায়ক তারেক আশরাফ, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের আহবায়ক বাবলু চাকমা, ছাত্র গণমঞ্চের সমন্বয়ক নাসিম সরকারের নামে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে ছাত্রনেতৃবৃন্দ বলেন, ‘ভবনধস ও শ্রমিক হতাহতের এই ঘটনা অপ্রত্যাশিত কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর একই ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিক ইউনুস আলী এবং ২০২২ সালের ৩১ মে আরেক নির্মাণাধীন ২০তলা একাডেমিক ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিক সাগর এবং ২ ফেব্রুয়ারি ভবনগুলোর নির্মাণ সামগ্রী বহনকারী ট্রাকের চাপায় শিক্ষার্থী হিমেলের মৃত্যু ভবিষ্যতে বড় ক্ষয়ক্ষতির আভাস দিয়েছিলো। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দায়িত্বে অবহেলা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ভবনগুলোর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ এর বেপরোয়া দুর্নীতি, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে একটি হত্যা কাঠামো সৃষ্টি হয়েছে। যাতে যে কেউ যেকোনো মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারে।’

ইত্তেফাক/পিও