সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মোসাফিরদের শান্তি অন্বেষণ

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৪৯

মূলত দুইটি জিনিস না থাকিলে জীব প্রজাতির অস্তিত্ব বিলীন হইয়া যাইবে। ইহার একটি হইল খাদ্য, অন্যটি রিপ্রোডাকশন, অর্থাত্ প্রজনন। মানুষ তো সৃষ্টির সেরা জীব। সুতরাং এই দুইটির পাশাপাশি মানুষের আরো একটি বড় চাওয়া হইল শান্তিতে বসবাস। প্রখ্যাত কবি শহীদ কাদরী লিখিয়াছেন—‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/ কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...’।  যিনি ছোট্ট কুঁড়েঘরে থাকেন, তিনিও শান্তি চাহেন, যিনি আলিশান অট্টালিকাবাসী, তিনিও শান্তির অন্বেষণ করেন। অর্থাত্ শান্তি ধনী-নির্ধন—সকলেই চাহেন। আরো একটি মিল গরিব-ধনী সকলেরই রহিয়াছে। তাহা হইল—মানুষ মহান আল্লাহর নিকট হইতে আসিয়াছে, চলিয়াও যাইবে আল্লাহর নিকট। অর্থাত্ আমরা এই জগতে মোসাফির মাত্র। ক্ষণিক সময়ের জন্য আসা, অন্যদিকে চিরকালের জন্য চলিয়া যাওয়া। অথচ এই ক্ষণিক সময়ের ব্যাপ্তিকাল—ধরা যাক শত বত্সর—আমাদের নিকট ভ্রমক্রমে দীর্ঘ সময় মনে হয়। আর এই বিভ্রান্তিময় দীর্ঘ সময়ের তিষ্টকালে আমরা শান্তি চাই। শান্তি চাই বটে, কিন্তু আমরা শান্তির ছায়ার পিছনে ছুটিয়া মরিতেছি। বলা যায়, বেশির ভাগ মানুষই শান্তির নহে, শান্তির ছায়া ধরিতে জীবনভর ছুটিয়া বেড়ায়।

পরিহাসের কথা হইল, শান্তি ও স্বস্তিতে থাকিবার স্বার্থেই মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটিয়াছে। সিন্ধুসভ্যতা হইতে শুরু করিয়া মিশরীয়, সুমেরীয়, পারস্য, ব্যাবিলনীয়, রোমান প্রভৃতি সভ্যতার মূলে ছিল মানবজীবনে স্বস্তিদান করা। বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা আরাম-আয়েশের একটি প্রাচুর্যময় পৃথিবীতে বসবাস করিতেছি। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও একজন রাজাবাদশা চাহিলেও আজিকার মতো ভোগবিলাস করিতে পারিত না। এখন ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন মেম্বারের বাড়িতেও এমন ব্যবস্থা থাকে, গরম লাগিলে এক সুইচেই ঠান্ডা হাওয়া, ঠান্ডা লাগিলে গরমের ব্যবস্থা। ভোগবিলাস খাদ্যখানায় বিচিত্র রেসিপি, যখন-তখন দেশে-বিদেশে উড়ান দিয়া বেড়াইতে যাওয়া—সকল কিছুই যেন আলাদিনের চেরাগের মতো, চাহিলেই পাওয়া যায়। এত কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু শান্তি কোথায়? কোথায় পালাইল শান্তি? শান্তি কি আসে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন—‘নয়ন মেলি শুধু দেখে যাও, হূদয় দিয়ে শুধু শান্তি পাও।’ আসলে শান্তি হইল দুইটি বিষয়ের সমন্বয়। উহার একটি হইল—নিরাপত্তা, অন্যটি আমাদের মানসিক দিক। ইংরেজিতে ইহাকে বলা হয়—পিস অব মাইন্ড ইজ এ মেন্টাল স্টেট অব কামনেস অর ট্রাংকুয়িলিটি। ইহা হইল উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা হইতে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীতে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা হইতে মুক্তি পাইতে হইলে নির্জন বনে গিয়া বসবাস করিতে হইবে। আরণ্যিক যুগের সেই অরণ্যও নাই, সেই নির্জনতাও নাই। আমাদের চারিদিকে ছায়াযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতি। ভূরাজনৈতিক কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিচিত্র ধরনের অস্থিরতা ও যুদ্ধাবস্থা দেখা যাইতেছে। কান্ডারি হুঁশিয়ার কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলিয়াছেন—‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ’। সন্তরণ অর্থাত্ সাঁতার না জানিয়া আমরা স্বখাদ সলিলে ডুবিতেছি। তাহা হইলে উপায়? ইংরেজিতে একটি কথা আছে—ওয়ার ফর পিস। অর্থাত্ শান্তির জন্য যুদ্ধ।  কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর শান্তির অহিংস বাণী এইভাবেও শোনাইয়াছেন যে—‘চোখের বদলা লইতে অন্যের চোখ উপড়াইয়া লইলে একসময় পুরা পৃথিবী অন্ধ হইয়া যাইবে।’ সেই ক্ষেত্রে আমাদের স্মরণ করিতে হয়, রোনাল্ড রিগানের কথা—‘শান্তি মানে সংঘাতের অনুপস্থিতি নহে, ইহা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত পরিচালনা করিবার ক্ষমতা।’ জটিল কথা। যেমনটি বলিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যায়কে সহ্য না করিবার কথা। তিনি আরেকটি কবিতায় বলিয়াছেন—‘নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—।’

সত্যিই কি শান্তির ললিত বাণী ব্যর্থ পরিহাসের মতো শুুনাইবে? ইহার চাইতে পরিতাপের কথা আর কী হইতে পারে? সুতরাং কবির কণ্ঠে আমরাও বলিতে চাই—‘বিদায় নেবার আগে তাই/ ডাক দিয়ে যাই/ দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/ প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।’

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন