সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

অন্ধ থাকিলে প্রলয় বন্ধ হইবে না

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০

একটি দেশ কতখানি সভ্য এবং উন্নত, তাহা জানিতে হইলে সেই দেশের সংখ্যালঘুদের নিকট জিজ্ঞাসা করিতে হইবে, তাহারা কেমন আছে। সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন ও ভীতির মধ্যে রাখিয়া এই একবিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশ আধুনিক, সভ্য ও উন্নত হইতে পারে না। বরাবরই বলা হইয়া থাকে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হইল অসাম্প্রদায়িক দল। তাহাদের ভোট দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হইতে হইয়াছে বলিয়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে। বিশেষ করিয়া ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পরাজিত হইলে ব্যাপক আকারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নির্যাতনের শিকার হইয়াছিল; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই বারের নির্বাচনেও সংখ্যালঘুরা নির্বাচনকেন্দ্রিক নির্যাতনের শিকার হইয়াছে!

গত শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা জানাইয়াছেন যে, গত ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ও পরে মোট ১০ দিনে (৪—১৩ জানুয়ারি) সংখ্যালঘু নির্যাতন ও হামলার অন্তত ১৩টি ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহার সকলই নির্বাচনকেন্দ্রিক। এই সকল ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক জন নিহত ও ৩৭ জন আহত হইয়াছেন। ঝিনাইদহ-২ আসনে এক জন সংখ্যালঘুকে হত্যা করিবার পাশাপাশি আরো ১২টি নির্যাতন ও হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। দৃষ্টান্তক্রমে বলা যায়, নির্বাচনের পর পিরোজপুর-২ আসনভুক্ত স্বরূপাকাঠী (নেছারাবাদ) ও পিরোজপুর-১ আসনের নাজিরপুর উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দাদের উপর হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ায় পিটাইয়া আহত করা, হাত-পা ভাঙিয়া দেওয়া, তাহাদের বাড়ি বা দোকানে অগ্নিসংযোগ করা বা তালা মারিয়া বন্ধ করিয়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়াছে। সংখ্যালঘুদের নির্বাচনকেন্দ্রিক এই সকল নির্যাতনের ঘটনার দায় আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই এড়াইতে পারে না বলিয়া মনে করেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা। তাহারা বলিতেছেন, এই বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন হইয়াছে মূলত আওয়ামী লীগের নিজেদের, শরিক বা সমর্থক প্রার্থীদের মধ্যে। ইহার পরও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের উপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনা কী করিয়া ঘটিল? এই গোলটেবিল বৈঠকে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলিয়াছেন, সরকার বলিতে পারে, এইগুলি ঘটে নাই, বানোয়াট, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। সরকারের লোকজন নিজেদের দায়বদ্ধতা স্বীকারই করেন না। তাহারা যেইভাবে কথা বলেন, তাহাতে গা শিউরে উঠে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসাবে তাহারা দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিক।

আমাদের এইখানে আরো গভীর পর্যবেক্ষণ রহিয়াছে। কোনো সন্দেহ নাই, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হইল যথার্থ অসাম্প্রদায়িক দল। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষও কখনো বিশ্বাস করিবে না যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন করিতে পারে; কিন্তু তাহার পরও কেন সংখ্যালঘুরা প্রায়শই নির্যাতনের শিকার হইতেছেন? ইহার কারণ হইল, বাঘের ঘরে ঘোগের বাস। আমরা অনেক বারই বলিয়াছি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্দরে রং বদলাইয়া প্রবেশ করিয়াছে রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের বংশধরেরা। একই চিত্র প্রশাসনেরও কোথাও কোথাও দেদীপ্যমান। বলা হয় যে, প্রশাসনকে অবশ্যই অসম্প্রদায়িক ও নিরপেক্ষ হইতে হইবে। এই নিরপেক্ষতা অবলম্বন ব্যতীত স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করিতে পারে না; কিন্তু প্রশাসনের মধ্যেও যদি বড় বড় দায়িত্বে রাজাকার, আলবদর, আলশামসের মতো স্বাধীনতাবিরোধী মতাদর্শের বংশধর ও পোষ্যরা আসীন থাকে, তাহা হইলে যাহা হইতে পারে, তাহাই হইতেছে। এই অবস্থায় সংখ্যালঘুদের উপর কিছু কিছু নির্যাতনের ঘটনা না ঘটাটাই অস্বাভাবিক।

এই যখন চিত্র, তখন ইহার দায়ভার অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আওয়ামী লীগকেই লইতে হইবে। কারণ, তাহাদের উপর ভর করিয়াই স্বাধীনতাবিরোধী মতাদর্শের বংশধর ও পোষ্যরা সকল ধরনের অপকর্ম করিতেছে। যেই সকল সোর্স হইতে আওয়ামী লীগের শীর্ষমহলে রিপোর্ট যায়, উহাতেই ভেজাল থাকে। কারণ, রাজাকারদের অর্থ ও ইচ্ছা অনুযায়ীই রিপোর্ট তৈরি হয়। সুতরাং, আওয়ামী লীগকে চক্ষু মেলিয়া তাকাইতে হইবে। অন্ধ থাকিলে প্রলয় তো বন্ধ হইবে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন