শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

যোগাযোগব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়ন!

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হইল যোগযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগ, জেলা-উপজেলা এমনকি তৃণমূলের ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়ন হইয়াছে। এই সকল উন্নয়নের পাশাপাশি লাগিয়াছে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়াও। এক মেট্রোরেল রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব সৃষ্টি করিয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। যেই যানজট লইয়া ঢাকা নগরবাসী সীমাহীন দুর্ভোগ ও কষ্টে নিপতিত ছিলেন, এখন মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কল্যাণে চিরচেনা যানজট তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় হ্রাস পাইতে শুরু করিয়াছে। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল ও কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পূর্ণরূপে চালু হইলে রাজধানীবাসীর চলাফিরা আরো সহজ, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হইয়া উঠিবে।

এই মুহূর্তে সুখবর হইল, মেট্রোরেল, লাইন-৫ নির্মাণের জন্য সাহায্যদাতা সংস্থা ও দেশের তহবিল নিশ্চিত হইয়াছে। একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের খবরে বলা হইয়াছে যে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ৩ বিলিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়া ১.৫ বিলিয়ন ডলার প্রদান করিবে। বাংলাদেশ সরকার প্রদান করিবে অবশিষ্ট অর্থ। ইহাতে মোট খরচ দাঁড়াইবে ৫.১ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে উত্তরা হইতে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ চালু রহিয়াছে। আবার এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) এবং এমআরটি লাইন-১ মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হইয়াছে। মেট্রোরেল-৫-এর দুইটি অংশ। নর্দার্ন অংশ গাবতলী হইতে হেমায়েতপুর হইয়া ভাটারা পর্যন্ত এবং সাউদার্ন অংশ গাবতলী হইতে হাতিরঝিল হইয়া আফতাবনগর বালুরপাড় পর্যন্ত। সামগ্রিকভাবে ছয়টি এমআরটি লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইয়াছে এবং ইহার বাস্তবায়ন হইলে ঢাকা শহরে যানজট বলিয়া আর কিছু থাকিবে না। কেননা দ্রুতগামী, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, বিদ্যুচ্চালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূরনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা হইল মেট্রোরেল। মূলত ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিতেছি, তাহার বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে যোগাযোগব্যবস্থায় এই বিপুল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হইতেছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে ইসিবি চত্বর হইতে মিরপুর ডিওএইচএস ও মিরপুর সাড়ে এগারো নম্বর এলাকাকে সংযোগকারী কালশী উড়াল সেতু উদ্বোধনের পর ইহা মিরপুরের সহিত বনানী, উত্তরা এবং রাজধানীর পূর্বাংশের যোগাযোগ আরো সহজ করিয়াছে। থার্ড টার্মিনাল চালু হইলে তাহা দেশের বিমান যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল ও দৃষ্টিনন্দনীয় পরিবর্তন সাধন করিবে। রাজধানী ছাড়াও সমগ্র দেশে স্থল, জল, বিমান প্রভৃতি যোগাযোগব্যবস্থার যে উন্নয়ন হইয়াছে তাহাও বিস্ময়কর। পদ্মা সেতু নির্মাণ দক্ষণাঞ্চলের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এই সকল অঞ্চলের মানুষ এখন দ্রুততম সময়ে রাজধানীতে আসা-যাওয়া করিতে পারিতেছেন। পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ ও ঢাকা-কক্সবাজার পর্যন্ত রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কারণে মানুষ দারুণভাবে উপকৃত হইতেছেন। ইহা ছাড়া মহাসড়ক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, উভয় পার্শ্বে সার্ভিস লেনসহ মহাসড়ক চার লেন বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীতকরণ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে ফ্লাইওভার নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ, যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতকরণ, ঢাকা-গাজীপুর-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, বিভিন্ন রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ বা সংস্কারের ফলে জনজীবনে ফিরিয়া আসিতেছে শান্তি ও স্বস্তি। 

বর্তমান সরকারের যোগাযোগবান্ধব নীতির ফলে এই খাতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসিয়াছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে লইয়া সাউথ এশিয়া সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় একটি সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাও গড়িয়া তোলা হইতেছে। ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০৪১’ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সকল মহাসড়ক ছয় লেন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আট লেনে উন্নীত ও দেশের প্রতিটি জেলার সহিত রেল পরিষেবা চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে সরকার। যোগাযোগের ক্ষেত্রে সড়ক, রেল, আকাশ ও নৌপথকে সমান গুরুত্ব দিয়া যে একটি আন্তর্জাতিক মানের যোগাযোগব্যবস্থা গড়িয়া তোলা হইতেছে তাহা সাধুবাদযোগ্য ও প্রশংসনীয়। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এবং পটুয়াখালীর পায়রাতে চলিতেছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ। ইহাতে বদলাইয়া যাইবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও। বলা যায়, সার্বিকভাবে যোগাযোগব্যবস্থার এক বিস্ময়-জাগানিয়া অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটিয়াছে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন