সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কেমন হবে আগামীর স্মার্ট পরিবেশ

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:৩০

টাইম মেশিনে চড়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে গিয়ে দেখলেন, গ্যাসমাস্ক পরা মানুষ ঘুরছে। শ্বাস নিতে গিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই হাঁপিয়ে উঠছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য করছে হাহাকার। সুজলা-সুফলা চিরসবুজ বাংলার মাটি ফেটে চৌচির। আবার অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ভিটেমাটিছাড়া হচ্ছে মানুষ। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে জনজীবন ও অর্থনীতি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যনতুন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

টাইম মেশিনে হোক অথবা ঘুমের মাঝে কিংবা কল্পনায়, আপনি কি ভবিষ্যতে এমন বাংলাদেশ দেখতে চান? না, একদমই না। ভবিষ্যত্ বদলাতে হলে এখনই আমাদের কাজে নেমে পড়তে হবে। এমন প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশী ধূসরের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর তাই প্রাণ-প্রকৃতিতে সমৃদ্ধ অপার সম্ভাবনাময় উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

প্রাকৃতিক পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রেহাই দিলেই ভালো থাকবে পরিবেশ। প্রশ্ন জাগতেই পারে, প্রকৃতির দূষণ না করে আমরা উন্নত বাংলাদেশ কীভাবে হব? উন্নত হতে হলে তো দেশে শিল্পায়ন ঘটবে। শিল্পকারখানা হলে তো অবধারিতভাবে দূষণ হবে।

এ প্রসঙ্গেই আসে টেকসই উন্নয়নের আলাপ, যেখানে প্রাধান্য থাকবে পরিবেশের। এটা সত্য যে, শিল্পকারখানা থেকে উত্পাদিত বিভিন্ন উপজাত পদার্থ ও বর্জ্য পরিবেশকে দূষিত করে। কিন্তু শিল্পকারখানার উত্পাদন প্রক্রিয়াকে তো আমরা পরিবেশবান্ধব করতে পারি। উত্পাদিত বর্জ্য পরিশোধন এবং উপজাত পদার্থগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এই সমস্যার টেকসই সমাধান করা সম্ভব। নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও বিদ্যমান প্রযুক্তির ব্যবহার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আশাবাদের বিষয়, দেশের তরুণ প্রজন্ম ইতিমধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। চামড়া, বস্ত্র, পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানা থেকে নিঃসৃত বর্জ্যে থাকা লেড, ক্রোমিয়াম, সালফাইডসহ নানাবিধ দূষকের মাত্রা জানিয়ে দেবে ছোট একটি ডিভাইস। নদীসহ যেকোনো জলাশয়ের পানিতে স্থাপন করা যায় এটি। ডিভাইসটির মাধ্যমে যেকোনো জায়গায় বসেই স্মার্টফোনে মুহূর্তেই দূষণের মাত্রা জানতে পারবেন মালিক, সরকার, ক্রেতা বা পরিবেশবাদীরা। এর মাধ্যমে দেশের পানির উত্সগুলো ব্যবহারের উপযোগী রাখার মাধ্যমে অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। দূষণের মাত্রা তদারকির দেশীয় ও সুলভ এই কার্যকর ডিভাইস তৈরি করেছেন বাংলাদেশি তরুণ এম এইচ এম মাজেদুর রহমান। এই ডিভাইস এমনকি মাছের খামারের পানির দূষণও সঠিকভাবে বলে দিতে পারে। এরকম তরুণদের হাত ধরেই আসবে আমাদের পরিবেশ দূষণ ও রক্ষার সমাধান।

স্মার্ট পরিবেশ নিশ্চিতে আমাদের অপচয় বন্ধ করতে হবে। বিশেষত, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি। বর্তমানে সবুজ পরিবেশ নিশ্চিতে সারা বিশ্ব ঝুঁঁকছে দূষণমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো দেশের বৃহত্তম সৌরবিদ্যুত্ কেন্দ্র তিস্তা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৬৫০ একর পরিত্যক্ত চরের জমিতে গড়ে উঠেছে এই স্মার্ট প্রকল্প। ৫ লাখ ৫০ হাজার সোলার প্যানেলের ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্র যেন কোটি সূর্যের আলো ধারণ করে দেশকে আলোকিত করছে। এতে কমবে দূষণ, বাড়বে জ্বালানি নিরাপত্তা। পাশাপাশি ঘটবে আঞ্চলিক উন্নয়নও। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।

কিন্তু বাংলাদেশ তো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। প্রকৃতিকে তো আর আমরা ঠেকাতে পারব না। তবে আমাদের অভ্যাসগুলোতে পরিবর্তন এবং বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

নদীমাতৃক ও বৃষ্টিবহুল বাংলাদেশে প্রতি বছরই বন্যার তাণ্ডবে ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের শিকার হয় কোটি মানুষ। এই হতাশার অন্ধকারে আশার আলো দেখিয়েছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ড, এটুআই আর গুগলের যৌথ প্রচেষ্টায় ২০২০ সাল থেকে চালু হয়েছে এই অভিনব উদ্যোগ। কখন বন্যা আসছে, আগে মানুষ সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারত না। এই উদ্যোগের ফলে তিন দিন থেকে তিন ঘণ্টা আগে বন্যা শুরুর ঝুঁঁকি, পানির সম্ভাব্য বৃদ্ধি ও হ্রাস, কোন এলাকা ঝুঁকিতে, এমনকি সুরক্ষা পরামর্শ ও জরুরি সেবার নম্বর—এমন সব তথ্যই চলে আসে স্মার্টফোনে!

শুধু একটি ক্ষুদ্র পুশ নোটিফিকেশন কোটি জীবন, কোটি স্বপ্ন বাঁচায়! এখন পর্যন্ত দেশের ৫৫টি জেলার ৯৯টি বন্যাপ্রবণ উপজেলায় এই সেবা চালু রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রান্তিক জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে এসএমএস পদ্ধতি তো রয়েছেই। এই সেবা আরো উন্নত করতে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর তথ্য সংগ্রহ চলছে। ব্যবহার করা হচ্ছে ডেটা অ্যানালেটিকস, আধুনিক কম্পিউটেশন পদ্ধতি ও ডেটা মডেল।

শুধু দুর্যোগ প্রস্তুতির উদ্যোগ নিয়েই স্মার্ট পরিবেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগের ঝুঁকি দিনে দিনে আরো বাড়ছে। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নেওয়া হয়েছে বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০।

বদ্বীপ পরিকল্পনা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এই পরিকল্পনায় শুধু পানি ব্যবস্থাপনা নয়, ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট বা জলবায়ুবান্ধব নগর পরিকল্পনা, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও নদীভিত্তিক পরিবহন, সুনীল অর্থনীতি এবং নবায়ণযোগ্য জ্বালানির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিগত ৫০ বছরের পরিবেশ ও জলবায়ুর তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ১০০টি আবহাওয়া কেন্দ্রও বসানো হয়েছে এই উদ্যোগের আওতায়। এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়িত হলে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে।

স্মার্ট পরিবেশ নিশ্চিতে আমাদের অন্যতম একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামুদ্রিক পরিবেশের দূষণ কমানো। সমুদ্র বিজয়ে প্রাপ্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ৭১০ কিলোমিটার উপকূল জুড়ে কম-বেশি মানব কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। স্থল উত্স থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং অপচনশীল অজৈব আবর্জনা এসে সমুদ্রে মিশে যায়; এতে সামুদ্রিক পরিবেশ, সমস্ত জীবের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্ষতি হয়। সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর যে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রাণিকুলের স্বাস্থ্যই নয়, স্থানীয় মত্স্যজীবী ও পর্যটনশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের পানি ও মাটিতে দূষক পদার্থের উপস্থিতি ছাড়াও সামুদ্রিক মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের (৫ মিলিমিটার ব্যাসের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কনা) উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা সামুদ্রিক জীব তো বটেই, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ভয়ংকর বিপত্সংকেত। সামুদ্রিক দূষণ কমানোর সমাধানগুলোর মধ্যে রয়েছে দূষণ প্রতিরোধের স্মার্ট উপায় নিরূপণে বিস্তর গবেষণা, নিয়মিত সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ। স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে সুনীল অর্থনীতির উন্নয়ন যেমন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমুদ্রস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দূষণমুক্ত স্মার্ট সামুদ্রিক পরিবেশ তৈরি অপরিহার্য। স্মার্ট সামুদ্রিক পরিবেশ বাস্তবায়নে বিওআরআই সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ ও এসডিজি-১৪—উল্লেখিত এসব লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দ্বারা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। গবেষণালব্ধ ফলাফলের যথাযথ প্রয়োগ এবং সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় এটি অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী। 

স্মার্ট পরিবেশ বাস্তবায়নে প্রযুক্তিই একমাত্র সমাধান নয়, মানুষের চেতনায়ও পরিবর্তন দরকার। যেমন—প্রচুর গাছ লাগানোর পাশাপাশি ২০-৩০ বছর বয়সি বৃক্ষগুলো আগলে রাখতে হবে। কেননা, এরাই কার্বন শোষণের মহামন্ত্র। ছাদবাগানের ছায়ায় শীতল হবে পরিবেশ, কমবে বিদ্যুতের খরচ। দেশের প্রত্যেক নাগরিককে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সচেতন করতে হবে। সবার অংশগ্রহণে ছোট ছোট এসব পদক্ষেপই বয়ে আনবে ইতিবাচক ফল।

দেশের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে জনমত গঠনে আরো ভূমিকা রাখবে। মাত্র ০.৪ শতাংশ কার্বন নিঃসারণ করেও বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের বিরাট অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রতিবেশগত ক্ষতি আমাদের বহন করতে হচ্ছে। আমাদের মতো দেশগুলো সঙ্গে নিয়ে এই ক্ষতির বিষয়ে সোচ্চার হয়ে ক্লাইমেট জাস্টিস নিশ্চিত করা হবে। পৃথিবী এখন এক, আর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবারই একসঙ্গে কাজ করা চাই।

২০৪১ সাল অনেক দূরে মনে হলেও এই স্মার্ট পরিবেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির হাত ধরে, সচেতনার আলো জ্বেলে আমরা এগোব। নির্মাণ করব এক সুন্দর, টেকসই বাংলাদেশ। প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি পাড়া, প্রতি জেলায় আমাদের উদ্যোগগুলো রাখবে সাফল্যের ছাপ। লিখবে সুস্থ, নিরাপদ, সবার বাসযোগ্য এক পৃথিবীর গৌরবময় ইতিহাস।

লেখক: অধ্যাপক, মেটিওরোলজি বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন