বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ডলার-সংকটের শেষ কোথায়?

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

দেশে দেড় বছর ধরে ডলার-সংকট চলছে। ফলে ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকা হয়েছে। তবে বাজারে লেনদেন হচ্ছে ১২০ টাকার বেশি দামে। এর প্রভাবে চলতি হিসাবের পাশাপাশি আর্থিক হিসাবও এখন ঘাটতিতে রয়েছে। গত ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার (৪৮ বিলিয়ন)। ডলার-সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্ধেকের বেশি কমেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী, এখন রিজার্ভ ২০ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলারের কম। এজন্য ডলার-সংকট ও ডলারের দামের অস্থিতিশীলতা রোধে ‘ক্রলিং পেগ’ নামে নতুন পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে টাকার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি চালু হবে। এই পদ্ধতিতে একটি মুদ্রার বিনিময় হারকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করার অনুমতি দেওয়া হয়। এখানে মুদ্রার দরের একটি সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা থাকে। ফলে একবারেই খুব বেশি বাড়তে পারবে না, আবার কমতেও পারবে না। জানা গেছে, ভিয়েতনাম, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, কোস্টারিকাসহ কিছু দেশ এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে।

সংকট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত তাদের গৃহীত পদক্ষেপ হচ্ছে আমদানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ডলারের ব্যবহার সীমিত করা। ডলারের ব্যবহার সীমিত করে বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট সংকট কখনো সামাল দেওয়া যায় না। এর বাইরে হুন্ডি বন্ধ করার নামে ক্রমাগত টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত রাখা হয়েছে। এতে প্রকারান্তরে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। মূলত চলমান ডলার-সংকট সামাল দিতে হলে ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আর ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমাদের কাছে মনে হয়নি।

তাই তাদের ধারণা ছিল যে, ক্ষণস্থায়ী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কয়েকটি মাস সামলে নিতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তারা যদি এমন ধারণা সত্যি পোষণ করে থাকে, তাহলে তাদের ধারণা যে ভুল, তা হয়তো তারা এরই মধ্যে ভালোভাবেই বুঝতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ। গত ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে ও আগামী জুনের মধ্যে তা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে গত ডিসেম্বর শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ ও সার্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল। মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের সুদহার কিছুটা বাজারভিত্তিক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি নীতি সুদের হারও বাড়িয়েছে। এতে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে একই সঙ্গে তারল্য সংকট ও উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতি রোধে নীতি সুদহার আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডলারের দাম বাজারের ওপর ছাড়া নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এক ধরনের স্পর্শকাতরতা আছে। তারা মনে করেন, একবার দাম নির্ধারণের বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলে সেটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা ঠিক বলা যায় না। এছাড়া এটা আবার নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দিহান বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে যে, তারা ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণের বিষয়টি বাজারের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে একটা ভয়ের ব্যাপার আছে। কারণ বাংলাদেশে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা এর ওপর নজরদারি করা সহজ নয়। ফলে ব্যাংক, মানি চেঞ্জার এবং কার্ব মার্কেটে, ডলারের দাম অনেক ওপরে উঠে যাবে। এতে করে যাদের দরকার, তারা ডলার পাবে না। কাজেই সংকট নিরসনে নজরদারি বাড়াতে হবে।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক-বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন