বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ব্যতিক্রমী পাঠাগার ও বই পড়িবার অভ্যাস

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

কত ধরনের যে ব্যতিক্রমী পাঠাগার রহিয়াছে আমাদের দেশে ও বিশ্ব জুড়িয়া, তাহার ইয়ত্তা নাই। আমরা যেমন বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে পাঠাগার গড়িয়া উঠিবার কথা জানি, তেমনি চরাঞ্চলের নদীর ঘাটে ‘লিটল ফ্রি লাইব্রেরি’রও সন্ধান পাই। পথ পাঠাগার ও সেলুন পাঠাগারের কথা তো বলাই বাহুল্য। বিশেষ করিয়া, সেলুন পাঠাগার আমাদের দেশের অনেক স্থানে জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। চুল-দাড়ি কাটিতে গিয়া মানুষ অবসর মুহূর্তে বই পড়িতেছে। ইহা বড়ই আনন্দের বিষয়। ইহা ছাড়া তিন চাকার ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার, দেওয়াল পাঠাগার, চলন্ত বাসের অভ্যন্তরে পাঠাগার ইত্যাদির কথাও অজানা নহে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ নামে যাহা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাও একপ্রকার পাঠাগারই বটে। এমনকি ২০০০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে প্রথম চালু হওয়া হিউম্যান লাইব্রেরির কথাও আমরা জানি, যাহার অনুসরণে এই দেশে একই ধরনের অনেক লাইব্রেরি ও সংগঠন গড়িয়া উঠিয়াছে। এখানে দৃশ্যত কোনো বই নাই, তবে মানুষই এইখানে বই। বলা যায়—জীবন্ত মানব বই, যাহারা একে অপরের সহিত তাহাদের গল্প ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

গত রবিবার ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ২ নম্বর গেটের বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত গ্রিনলাইন কাউন্টারের অভ্যন্তরে উদ্বোধন করা হইয়াছে একটি মিনি ‘অবসর পাঠাগার‘। বাস কাউন্টারের অভ্যন্তরে এই ধরনের পাঠাগার স্থাপনের বিষয়টিও অভিনব। ইহাতে যাত্রীরা অবসর সময়ে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন চ্যাটিং কিংবা ব্রাউজিংয়ে কিংবা আড্ডাসহ অন্য কোনোভাবে অযথা সময় নষ্ট না করিয়া বই পড়িয়া আলোকিত মানুষ হইতে পারেন এবং সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করিতে পারেন। ব্যতিক্রমী পাঠাগারের যাহারা উদ্যোক্তা, সেই সকল বইপ্রেমী মানুষকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে চলিতেছে একুশে বইমেলা। এই বইমেলা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। বইমেলাকে কেন্দ্র করিয়া প্রতি বত্সর এইখানে বইপ্রেমিক মানুষের ঢল নামে। তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশও ইহাতে অংশগ্রহণ করে। ইহা একটি আশ্যব্যঞ্জক দিক নিঃসন্দেহে। তবে সমগ্র বত্সরই যদি তাহাদের আগ্রহ ধরিয়া রাখা যায় এবং উল্লেখযোগ্য হারে তাহাদের মধ্যে বই পড়িবার অভ্যাস গড়িয়া উঠে, তাহা হইলে তাহা আমাদের সমাজ ও প্রকাশনাশিল্পের জন্য হইবে মঙ্গলজনক। বাস্তবতা হইল, এখন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিমাত্রায় ব্যস্ত ও আসক্ত। বই পড়িবার অভ্যাস ক্রমেই হারাইয়া ফেলিতেছে নূতন প্রজন্ম। অবশ্য তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ অনলাইনে বই পড়েন, ই-বুক লইয়া কাটান অবসর সময়। তাহাদেরও আমরা উত্সাহিত করি; কিন্তু যাহারা একেবারেই বই পড়া ছাড়িয়া দিয়াছেন, তাহাদের ব্যাপারে আমরা উদ্বিগ্ন না হইয়া পারি না। অতিমাত্রায় স্মার্টফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহার করিবার কারণে চোখের যে সমূহ ক্ষতি হয়, তাহা হইতে বাহির হইয়া আসিবার জন্য এবং বসিয়া, শুইয়া ও বাসে-ট্রেনে চলিতে চলিতে নানা উপায়ে পড়িবার সুবিধার্থে হইলেও প্রিন্ট ভার্শন বইয়ের চাহিদা থাকিয়া যাইবে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।

বস্তুত বই পড়িবার ফলে পাওয়া যায় এক নির্মল আনন্দ। ইহার ফলে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলিয়া যায়। বৃদ্ধি পায় কল্পনাশক্তি। আর এই সকল দক্ষতা কর্মজীবনে পরিকল্পনা গ্রহণ ও তাহার বাস্তবায়নে ফলপ্রসূ হয়। এই জন্য বলা হয়, বই কিনিয়া কেহ দেউলিয়া হয় না। বইপাগল মানুষের অপরাধপ্রবণ হইয়া উঠা খুবই কঠিন। তরুণসমাজকে মাদকাসক্তি, উত্ত্যক্তকরণ, কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ক্ষতিকর প্রবণতা হইতে মুক্তি দিতে তাহাদের মধ্যে বই পড়িবার আন্দোলন বেগবান করা প্রয়োজন। বই জ্ঞানগরিমার এক বিপুল উত্স। একটি জ্ঞাননির্ভর, আলোকিত ও সমৃদ্ধ জাতিগঠনে ঘরে ঘরে ব্যক্তিগত পাঠাগার গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। সম্ভব হইলে সেই পাঠাগার প্রতিবেশী ও কমিউনিটির মানুষের জন্য যথাসম্ভব উন্মুক্ত করিয়া দেওয়া যাইতে পারে। ইহার সহিত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, উপাসনালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে নিত্যনূতন পাঠাগার স্থাপন ও পুরাতন পাঠাগারগুলি পুনর্জীবিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন জেলা-উপজেলার সরকারি গ্রন্থাগারগুলির শ্রীবৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন