বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতিশোধমূলক হামলা মিলিশিয়াদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারবে?

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্র ও শনিবারে চালানো ঐ হামলায় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের কয়েক ডজন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। দিন কয়েক আগে জর্ডানের এক মার্কিন ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে তিন জন মার্কিন সেনা সদস্যকে হত্যার প্রতিশোধ নিতেই মূলত এই সাঁড়াশি আক্রমণের পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন। ইরাক ও সিরিয়ায় ৮৫টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ৪০ জন। মার্কিন বোমারু বিমানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া স্থাপনাগুলোর সঙ্গে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা বাহুল্য, এ ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্য আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত বয়লারের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে বলছেন, যে-কোনো সময় এর বিস্ফোরণ ঘটতে পারে!

ঘটনা গত ২৮ জানুয়ারির। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনায় তিন সেনা নিহত হন। আল-মুকাওয়ামা আল-ইসলামিয়াহ ফি আল-ইরাক বা ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’ নামক ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী ঐ হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনার পর ওয়াশিংটন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না—সেটাই স্বাভাবিক। ফলে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের পালটা হামলা।

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু করার কথা ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স গোষ্ঠীকে। তবে আক্রমণ কেবল এই গোষ্ঠীর ওপরই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সন্দেহজনক অন্য সব গোষ্ঠীও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’ যে একা প্রতিশোধের মুখে পড়বে না, তা জানাই ছিল। কারণ, এটা নেয়াত কোনো একক গোষ্ঠী নয়। বরং একে সমমনা গোষ্ঠীগুলোর ‘ছাতা (আমব্রেলা)’ বললেও ভুল বলা হবে না। এটা সেই গোষ্ঠী, যারা ২০২০ সাল থেকে এই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন মিলিশিয়াকে একই শামিয়ানার নিচে সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করে আসছে।

২৮ জানুয়ারির ড্রোন হামলায় জড়িত থাকার কথা ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে বটে, কিন্তু এতটুকুতেই কি ঝামেলা মিটে যাবে? স্বভাবতই না। ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সসহ মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর যে নেটওয়ার্কের কথা শুনতে পাওয়া যায়, তার পৃষ্ঠপোষকতাকারী হিসেবে একটাই নাম আসে—‘তেহরান’। অভিযোগ রয়েছে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস কুদস ফোর্সের মাধ্যমে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকে সক্রিয় রাখা হয়। চলে আসছে এভাবেই। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গোষ্ঠীগুলোর তত্পরতা বেশ বেড়ে গেছে বলে শোনা যায়। বিশেষত, গত কয়েক মাসের ব্যবধানে সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন বাহিনীর আবাসস্থলগুলোতে ১৫০টিরও বেশি হামলা চালিয়েছে মিলিশিয়া গ্রুপগুলো। বিষয়টা শুনতে যত সহজ, এর তাত্পর্য ঠিক ততটাই জটিল।

ঠিক কোন পরিস্থিতিতে মিলিশিয়া গ্রুপের স্থাপনাগুলো মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, তা এতক্ষণে পরিষ্কার বুঝতে পারার কথা। এখন প্রশ্ন হলো, মার্কিন অভিযানের লক্ষ্য কি কেবলই ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর আগ্রাসন বন্ধ করা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরো গভীরে যেতে হবে।

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণের পরের সময়কার কথা। বিদেশি সামরিক উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের। তেহরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়াদের এক কাতারে জড়ো করার কাজে হাত দেয় এই গোষ্ঠী। গ্রুপগুলো এগোতে থাকে একই মিশনকে সামনে রেখে। এর ফলে ‘একক ব্যানারে হামলা’ চালানো সহজতর হয়ে ওঠে তাদের জন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিসর বাড়ে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের। মিশন শুরু করে সিরিয়া ও লেবাননসহ ইরাকের বাইরেও। এক কথায়, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের কাছে ‘অন্যতম ফ্রন্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয় ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘সমন্বিত শক্তি’ হিসেবে কাজ করছে এই গোষ্ঠী।

মজার ব্যাপার হলো, তেহরানের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এই অঞ্চল জুড়ে কাজ করলেও ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের মতো দেশগুলোতে ‘স্বতন্ত্র এজেন্ডা’ রয়েছে মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর। মূলত এরূপ পটভূমিতেই গোষ্ঠীগুলো ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের ব্যানারে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করে আসছে। ২৮ জানুয়ারির ঘটনা তথা জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি টাওয়ার ২২-এ হামলা এই ধারাবাহিকতার একটা অংশ মাত্র।

দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পালটা হামলা কতটা ফলপ্রসূ হয়। এর মধ্য দিয়ে ঠিক কী ধরনের অগ্রগতি অর্জন করে এই পক্ষ। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড ইতিমধ্যে জানিয়েছে, এই অপারেশনের লক্ষ্য হচ্ছে আইআরজিসি ও এর ইরান-সমর্থিত প্রক্সিগুলোর অপারেশনাল সক্ষমতা ধ্বংস করা। অস্ত্র কিংবা সাপ্লাই নেটওয়ার্ককে উল্লেখযোগ্যভাবে ধসিয়ে দেওয়া। কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার, গোয়েন্দা সুবিধাদি, রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং লজিস্টিক ও যুদ্ধাস্ত্রের ভান্ডার গুঁড়িয়ে দেওয়া। সর্বোপরি কেবল অপারেশনাল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করাই নয়, ভবিষ্যতে যেন গোষ্ঠীগুলো সর্বাত্মক হামলা চালানোর মতো অবস্থায় না থাকে, সেই ব্যবস্থা করা। যদিও এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন কতটা সহজ হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বস্তুত, জর্ডানে হামলার ঘটনায় ইরানের তৈরি একটি ড্রোন পাওয়ার পর থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের পথে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র। আঁটছে নতুন সব কৌশল। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মোকাবিলার প্রশ্নে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে আইআরজিসি অফিসারদের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হচ্ছে। হামাস ও হিজবুল্লাহকে সহযোগিতা করছে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও। এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে সাইবার আক্রমণ পরিচালনা করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পালটা ব্যবস্থা গ্রহণের পর এই অঞ্চলে ইরানের কৌশল কতটা প্রভাবিত হবে কিংবা আদৌ প্রভাবিত হবে কি না। লক্ষ করার বিষয়, ২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার আগেই মার্কিন স্থাপনাকে আর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না করার ঘোষণা দিয়েছিল ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহ। ধরে নেওয়া যায়, ইরানের চাপেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হয় হিজবুল্লাহ। এর মধ্য দিয়ে আরো একবার প্রমাণিত হয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসা এসব গোষ্ঠী চলে তেহরানের ইশারায়।

মার্কিন বিমান হামলা, নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থাগুলো কাজে এসেছে বলা যায়। এই অর্থে, ইরান ও এর প্রক্সিদের বড় ধরনের আগ্রাসন থেকে দূরে রাখতে একে ‘বহুমুখী কার্যকর কৌশল’ হিসেবে অবিহিত করতে হয়। কারণ, এর মধ্য দিয়ে বিশেষ করে সিরিয়া ও ইরাকে ইরানের আধিপত্য কিছুটা হলেও কমে গেছে। শুধু তা-ই নয়, এটা মার্কিন স্বার্থের হুমকির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে। মাথায় রাখতে হবে, আঞ্চলিক প্রক্সিদের সমর্থন করা থেকে দূরে রাখার পাশাপাশি ইরানকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করাই যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য এবং তা কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে ইরাক ও সিরিয়ায় পরিচালিত অভিযানের মধ্য দিয়ে।

আরেকটি বিষয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমানো বা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই প্রতিশ্রুতির বাণী শুনিয়ে আসছে মিত্রদের। তেহরানের আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার কৌশল, আলোচনার ক্ষেত্র ও অবস্থান এবং জোট গঠনের ক্ষমতাকে খর্ব করাই ওয়াশিংটনের মূল মিশন। এই হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার।

অন্যদিকে এ কথাও সত্য, এই এক দফা হামলা ইরান ও এর প্রক্সিদের আগ্রাসন রোধে কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে কিছুটা হলেও সংশয় থেকেই যায়। বিমান হামলা কিংবা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও অনিশ্চিয়তা দূরে সরিয়ে রাখা যায় না পুরোপুরি। ইতিহাসও বলে সেই কথাই! বহু বছর ধরেই এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাব কমানোর মিশন হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এতে কাজের কাজ কতটা হয়েছে? গত ৭ অক্টোবর ইসারাইলে হামাসের হামলার কথাই যদি ধরা হয়, তা তো আটকানো যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এযাবত্ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের পরও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণই-বা কতটা থামানো গেছে, তাও ভেবে দেখার বিষয়।

বাস্তবতা হলো, ইরানের স্বার্থের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো প্রত্যক্ষ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা এই অঞ্চলে কেবল উত্তেজনাই বাড়িয়ে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান-সমর্থিত বাহিনীগুলোর মধ্যে কেবল ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনাই ঘটতে থাকবে ক্রমবর্ধমানভাবে। টিট-ফর-ট্যাট—‘ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়’ ধরনের প্রবণতা চলতে থাকবে। এর ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যাবে অনেকখানি। সর্বোপরি বলতে হয়, গত ৭ অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলার জের ধরে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানোর ঘটনার রেশ ধরে চলমান পরিস্থিতি আরো জটিল ও সংকটময় হয়ে উঠেছে। পানি কতদূর অবধি গড়ায়, সেটাই আসল কথা!

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে ইউএস মিলিটারি একাডেমি ওয়েস্ট পয়েন্টের কমবেটিং টেররিজম সেন্টারের সহকারী অধ্যাপক ও আমেরিকান ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের পিএইচডি গবেষক

দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন