বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বইমেলা, বই পড়া ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

আমরা জানি ‘একটি বই ১০০টি বন্ধুর সমান।’ বই পড়া এক দারুণ নেশা। এই নেশার মজা খুব কমসংখ্যক মানুষই পায়। যারা বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে পারে, তারা চিন্তা, চেতনা, প্রগতি ও সৃষ্টিশীলতায় অন্যদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকে। যিনি ভালো পড়েন তিনি ভালো লেখেন এবং ভালো বলেন। এটা প্রমাণিত সত্য।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি মাস। এ মাস এলেই বই পড়া এবং বইমেলার বিষয়টি চলে আসে। বইমেলা অনেকটাই যেন প্রাণের মেলা। দীর্ঘ একটি বছর অপেক্ষায় থাকে পাঠক প্রকাশক। বইমেলাকে কেন্দ্র করে সমাবেশ ঘটে লেখক ও পাঠকের। বইমেলাকে ঘিরে নবীন ও তরুণ লেখকদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে খ্যাতিমান লেখক ও সাহিত্যকদের। বইমেলাকে ঘিরে লেখক ও পাঠকদের প্রত্যাশাও থাকে অনেক।

বইমেলার প্রয়োজনীয় অপরিসীম। বই পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছুতে বইমেলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বইমেলা যে শুধু ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়, তা নয়। বইমেলা সারা বাংলাদেশেই জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়েও অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেসব বইমেলা আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। একুশে বইমেলা এবং অন্যান্য বইমেলার গুরুত্ব রয়েছে। বইমেলায় বই অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পাওয়া যায়। বইমেলার মাধ্যমে নতুন নতুন পাঠক তৈরি হয়। আমাদের দেশে যারা লেখালেখি করেন, তারা অপেক্ষায় থাকে বইমেলায় বই প্রকাশ করার। প্রতি বছর একুশে বইমেলায় নতুন লেখকের নতুন নতুন বই আসে। বই লেখা এবং বই প্রকাশ করা লেখকের মনে এক ধরনের প্রাণভরা উচ্ছ্বাস কাজ করে। বইমেলার মাধ্যমে অনেক লেখকের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। লেখক তার প্রকাশিত পুস্তক স্টলে বসে পাঠকের মনোভাব বুঝতে পারেন এবং পাঠকও লেখকের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অটোগ্রাফ সংগ্রহে রাখেন, ছবি তোলেন ও মতামত ব্যক্ত করেন। বইমেলা ছাড়া এটা অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব নয়। বইমেলার মাধ্যমে ভালো বই এবং গুরুত্বপূর্ণ বই খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। প্রতি বছর একুশে বইমেলা আনন্দ মেলায় পরিণত হয়। বইমেলায় শিশু কিশোর কর্নার থাকে। যেখানে বিভিন্ন আনন্দ আয়োজনের ব্যবস্থা রাখা হয়। কোমলমতি শিশুদের মনে বইমেলায় আগমনের মধ্য দিয়ে বইয়ের প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়। এবং এর প্রভাব সারা জীবন থেকে যায়।

বইমেলায় অনেকেই যায়। এখনকার সময়ে বইমেলার দর্শনার্থী বেড়েছে কিন্তু কমেছে পাঠক। বই কিনে ঘরে সাজিয়ে রাখা এবং শোপিস হিসাবে রেখে দেওয়ার প্রবণতাই এখন বেশি।

স্কুল কলেজ পর্যায়ের এখনকার ছেলেমেয়েরা লাইব্রেরি ওয়ার্ক করা বোঝেই না। অথচ একটা সময় লাইব্রেরি ওয়ার্ক করা আনন্দের একটি বিষয় ছিল। ছেলেমেয়েরা একা কিংবা দল বেঁধে লাইব্রেরিতে যেত প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ করে পড়ত। আবার এসব বই থেকে কিছু কিছু অংশ খাতায় লিখে বা নোট করে নিয়ে আসত। লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে পড়ার একটা প্রতিযোগিতা থাকত।

একটা বই সংগ্রহ করার জন্য অনেক দূরের লাইব্রেরিতেও যাওয়া হতো। আবার অনেক সময় আমরা দেখেছি, গ্রামের বিশেষ বিশেষ মানুষ নিজের উদ্যোগে লাইব্রেরি করত। গ্রামের ছেলেরা অবসরে এসব লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে নিয়ে পড়ত। আবার অনেক সময় এসব লাইব্রেরিতে বসেও পড়ার ব্যবস্থা থাকত। কে কয়টি বই পড়তে পারে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো। কিন্তু এখন সময় পালটে গেছে। পরিবার এবং গ্রামভিত্তিক লাইব্রেরি আর দেখাই যায় না। সময় এখন মোবাইল ফোন আর প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে। ছেলেমেয়েরাও বন্দি হয়ে পড়েছে মোবাইল ফোনের রঙিন স্ক্রিনে। ছাত্রছাত্রীদের অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারও বই না পড়ার অন্যতম কারণ। আরো একটি কারণ আছে আর তা হলো—সব বইয়ের এখন ওয়েব ভার্শন রয়েছে। গুগুল সার্চ করলেই সেসব পাওয়া যায়। এ কারণে ছেলেমেয়েরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বই সংগ্রহ করে পড়াকে সময় ক্ষেপণ মনে করে।

আসলে ছেলেমেয়েদের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করার জন্য পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য। প্রতিটি পরিবারে মিনি লাইব্রেরি থাকা প্রয়োজন। এই সব লাইব্রেরিতে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, আত্মজীবনীমূলক বই, প্রবন্ধ, নাটক ও নৈতিক শিক্ষামূলক বই রাখা যেতে পারে। ছেলেমেয়েরা যাতে এই সব বই পড়ে তার জন্য উত্সাহ দিতে হবে। প্রয়োজনে ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবা-মাকেও সময় দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে অভিভাবকরা একটু মনোযোগী এবং সচেতন হলেই ছেলেমেয়েদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। আর তাতেই সফল হবে আমাদের বইমেলা। আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠবে জ্ঞান এবং দক্ষতায়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, ভাওয়ালগড়, গাজীপুর

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন