বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

জোড়াতালির ফ্যাশন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

আজকাল যেন সকল কিছুর মধ্যেই জোড়াতালি দেওয়ার ব্যাপারটি ঢুকিয়া পড়িয়াছে। জোড়াতালির ভালোমন্দ উভয় দিকই রহিয়াছে, যেমন রহিয়াছে মিথ্যার ভালোমন্দ দিক। মিথ্যার আবার ভালো দিক কী? এমন প্রশ্ন করা হইলে ইহার সহজ উত্তরে বলা যায়—জীবন বাঁচাইবার স্বার্থে মিথ্যা বলা দূষণীয় নহে। একইভাবে জোড়াতালি দেওয়াটাও দূষণীয় নহে, যদি উহা হয় ইতিবাচক অর্থে। তাহা হইল মিতব্যয়িতা। জ্ঞানীগুণী প্রাজ্ঞ মানুষ মিতব্যয়ী হইয়া থাকেন। একটি জিনিস যতক্ষণ পর্যন্ত কাজে লাগানো যাইতেছে ততক্ষণ অবধি উহাকে কাজে লাগানোটা হইল অপচয় রোধ করা। আর কে না জানে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই। সুতরাং শয়তানের ভাই না হইবার জন্য জোড়াতালি দিয়া পোশাক পরিধান করা নিশ্চয়ই উত্তম ব্যাপার; কিন্তু আধুনিক কালে যাহাদের জীবনে সচ্ছলতা আসিয়াছে, তাহাদের সাধারণত আর জোড়াতালির প্রয়োজন পড়ে না। এখন জোড়াতালি দেয় তাহারাই যাহারা নিরুপায়, অসহায়। এই জন্য জোড়াতালি দেওয়া পোশাকে কোনো ব্যক্তিকে দেখিলে আমরা বহুকাল ধরিয়া মনে করিতাম তিনি দীনদরিদ্র; কিন্তু জোড়াতালি যখন দিকে দিকে ফ্যাশনে পরিণত হয়, তখন তাহা চিন্তার বিষয় বটে।

আধুনিক ফ্যাশনে আমরা দেখিতে পাই কেতাদুরস্ত ছেলেপুলেরা ছেঁড়াফাটা জোড়াতালি দেওয়া জিনসের শার্টপ্যান্ট পরিতেছে। মুখ না দেখিয়া শুধু পোশাক দেখিলে শুরুতে ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে ভবঘুরে বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু বাকি সাজসজ্জা দেখিয়া ভ্রম দূর হয়। যেন যত অধিক জোড়াতালি তত অধিক ফ্যাশন; কিন্তু কেন জোড়াতালি হইয়া উঠিতেছে ফ্যাশনের অংশ। ইহা বুঝিবার পূর্বে জোড়াতালির আভিধানিক অর্থ ও প্রয়োগ দেখে নেওয়া যাক। কোনোরকমে কাজ চালানোর ব্যবস্থা তথা ঠেকনা দিয়া কোনো প্রকারে কার্যোপযোগী করিবার চেষ্টাকে বলা হয় জোড়াতালি। ইহার সমার্থক বাগধারা হইল তাপ্পি মারা, কষ্টেসৃষ্টে, টায়টায়, টেনেটুনে, টেনেবুনে ইত্যাদি। জোড়াতালিকে ‘গোঁজামিল’ও বলা হইয়া থাকে। অর্থাত্ ‘জোড়াতালি’ হইল ‘বাজে বুঝ’ দেওয়া, উলটাপালটা হিসাব দিয়া অঙ্ক মিলাইয়া দেওয়া, কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়া হিসাব মিলানো। ইহা অবশ্যই ফাঁকিবাজি। যেনতেন প্রকারে মিল দিলেই তো আর মিল হয় না।

এই জন্য জোড়াতালি বহু ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক। একটি আয়না ভাঙিয়া গেলে উহা জোড়াতালি দিয়া ঠিক করিতে চাহিলে দুইটি প্রতিবিম্ব তৈরি করিবে। অর্থাত্ আয়নাটা তখন আপনার বিকৃত প্রতিবিম্ব প্রদর্শন করিবে। জোড়াতালি আমাদের দৃষ্টিকে আহত করে। জোড়াতালির মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন জিনিসও দৃষ্টিদূষণ ঘটায়। জোড়াতালি-মার্কা সম্পর্ক, কিংবা জোড়াতালির বাঁধ যে কোনো সময় বিপর্যয় ঘটাইয়া দেয়। এই জন্য জোড়াতালির বাঁধ হইল বালির বাঁধের সমতুল্য। সুতরাং জোড়াতালি দিয়া যখন কিছু করা হয়, তখন উহা কখনই টিকসই হয় না। আর টিকসই না হইলে জোড়াতালি হইয়া যায় সাময়িক ব্যবস্থা। এখন এই সাময়িক ব্যবস্থা যখন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তাহা হইয়া যায় নির্বুদ্ধিতা। যাহা টিকসই নহে, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সেই জোড়াতালির প্রয়োগ কখনই কোনো দূরদর্শী ব্যক্তি করিতে পারেন না। সুতরাং জোড়াতালি যদি কার্যকর হইত, তাহা হইলে কথা ছিল; কিন্তু যেই জোড়াতালি কাজে লাগে না, বরং ক্ষতির কারণ হয়—সেই জোড়াতালি দিয়া লাভ কী?

আমরা দেখিতে পাইতেছি, এই পৃথিবীতে, রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারে ও রাজনীতি-অর্থনীতি ইত্যাদিতে জোড়াতালির মাধ্যমে অনেক জঞ্জাল বাড়ানো হইতেছে। জোড়াতালি হইল কথায় ও কাজের অমিল। কথা ও কাজে মিল না থাকিলে তাহা কখনই শুভ ফল প্রদান করে না। এই জন্য জোড়াতালি ভাবিয়া চিন্তিয়া দেওয়া উচিত। কথায় আছে—ভাবিয়া করিয়ো কাজ, করিয়া ভাবিয়ো না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন