বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রঙিন সবজি চাষে নাটোরের কৃষক আব্দুল আলিমের সফলতা

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২১:৩৫

কৃষক আব্দুল আলিমের জমিজুড়ে রঙিন ফুলকপির শোভা। শুধু হলুদ-বেগুনি ফুলকপি নয়। এই কৃষকের সবজি জমিতে রয়েছে রঙিন বাঁধাকপি, বিষমুক্ত ক্যাপসিকাম, বারি-১২ জাতের রঙিন বেগুনও। অধিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে এসব সবজির দামও বেশি। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের বিলকাঠোর গ্রামে আব্দুল আলিমের বাড়ি। সেখানেই তার এই বিচিত্র সবজি ক্ষেত।

কৃষি বিভাগের পরামর্শে চলতি মৌসুমে কৃষক আব্দুল আলিম ১৭ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলক শীতকালীন এসব সবজি চাষ করা হয়েছিল। ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে আব্দুল আলিমের খেতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার সবজি উৎপাদন হয়েছে। কৃষক আলিমের এমন সাফল্যে এলাকায় সাড়া পড়েছে। নতুন আঙ্গিকে এই সবজি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এলাকার অনেক কৃষক।

যেভাবে শুরু রঙিন সবজি চাষ

কৃষিতে ভিন্নতা আনতে স্থানীয় কৃষি বিভাগ নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তারমধ্যে কৃষক আব্দুল আলিমের সবজি ক্ষেত অন্যতম। কৃষি বিভাগ বলছে, স্বল্প ব্যয়ে বিষমুক্ত উচ্চ ফলনশীল জাতের সবজি চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কৃষক আব্দুল আলিমের খেতে পরীক্ষামূলক নানা জাতের সবজি চাষ করা হয়েছে। কৃষক আব্দুল আলিম নাটোর এবং বগুড়ায় কৃষির উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ঢাকা থেকে বীজ সংগ্রহ করে কৃষি অফিসের অনুদানে নাটোর জেলায় এবারই প্রথম পলিনেটের মাধ্যমে বারি-১২ জাতের বেগুন, দুই জাতের রঙিন ফুলকপি, বেগুনি রঙের বাঁধাকপি, উন্নতজাতের মুলা এবং উচ্চ ফলনশীল ক্যাপসিকামের ২ হাজার ২০০ বীজ বপন করেছিলেন তিনি। এরপর চারা গজালে প্রক্রিয়ামতো রোপণ করেন। এতে ফলও পেয়েছেন ভালো। ভিটামিন এ, সি, ক্যারোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে এসব সবজিতে।

রঙিন সবজির দামে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন

আব্দুল আলিম ইত্তেফাককে জানান, নাটোর জেলার মধ্যে তার জমিতেই এই প্রথম রঙিন বিষমুক্তি সবজি চাষ করা হয়েছে। বাজারের সাধারণ টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকামের দাম বেশি। তিনি বলেন, চারা রোপণের পর থেকে পরবর্তী ৬০ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যেই এসব সবজি বিপণন যোগ্য হয়েছে। তার খেতের রঙিন ফুলকপি এবং বাঁধাকপি এবার আকার ভেদে ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে খুচরা বিক্রি করেছেন।

প্রতিটি গাছে এককেজির ওপরে কপির ফলন হয়েছে। অথচ সাধারণ ফুলকপির বর্তমান বাজার দর ৪০ থেকে ৫০ টাকা। অল্প সময়ে স্বল্প ব্যয়ে তিনি ১৭ শতাংশ জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, টমেটো এবং ক্যাপসিকাম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার। এরমধ্যে ক্যাপসিকাম প্রতিকেজি বিক্রি করছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।

তিনি জানান, বিচিত্র এসব সবজি চাষে তার চারা রোপণ থেকে ফসল উঠানো পর্যন্ত পরিচর্যা, সারসহ সার্বিক ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। খরচ বাদ দিয়ে ব্যাপক লাভ দেখছেন তিনি।

কম সময়ে সীমিত ব্যয়ে রঙিন এসব সবজি চাষ করা যায়। ফলনও হয় প্রত্যাশার তুলনায় বেশি। খেতে সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এসব সবজির চাহিদা বেশি। দামও ভালো। এ কারণে আগামী মৌসুমে শীতকালীন এসব সবজি চাষের জন্য কৃষি অফিসের আগাম পরামর্শ নিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।

কৃষি বিভাগ বলছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে এসব সবজি চাষ শুরু হয়েছে। নাটোর জেলায় গুরুদাসপুরের আব্দুল আলিমের খেতেই প্রথম চাষ করা হয়েছে ভিন্নজাতের সবজি। বাণিজ্যিকভাবে বিপনন হলেও জেলাজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়নি। সাদা সবজির চেয়ে রঙিন এসব সবজির পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। দেখতেও খুবই সুন্দর। দামও ভালা। তাই বাণিজ্যিক চাষ জেলাজুড়ে ছড়িয়ে দিতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হারুনুর রশীদ ইত্তেফাককে জানান, রঙিন এসব সবজি চাষে জৈব সারের ব্যবহার হচ্ছে। এ কারণে ক্ষতিকারক রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমছে। তাছাড়া রঙিন ফুলকপিতে পুষ্টিগুণ বেশি থাকে। পুষ্টিগুণ আর ভিন্ন রঙের কারণে স্থানীয় বাজারে এর প্রচুর চাহিদাও রয়েছে।

গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বাজারের সবজি বিক্রেতারা বলেন, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন আসায় সাধারণ সবজির চাহিদা কমেছে। দাম বেশি হলেও রঙিন সবজি কিনছেন মানুষ। এ কারণে আব্দুল আলিমের জমিতে গিয়ে তারা এসব সবজি পাইকারি দরে ক্রয় করে বাজারে আনছেন।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ ইত্তেফাককে জানান, নাটোর জেলায় প্রথম কৃষক আব্দুল আলিম রঙ্গিন ফুলকপিসহ অন্যান্য সবজি চাষ করেছেন। এই ফসল চাষাবাদে রাসায়নিক সার-কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। এই সবজি চাষে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করায় ব্যবসায়ী থেকে ভোক্তারা পর্যায়ে ব্যাপক আস্থা যুগিয়েছেন আব্দুল আলিম।

তিনি বলেন, রঙ্গিন ফুলকপিতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও বারে। রঙিন এসব সবজিতে ২৫ গুণ বেশি ভিটামিন এ উপাদান থাকে। যা ভিটামিন এ, সি, আয়রন, খনিজ উপাদান, বিটা কেরোটিন, যা শরীরে ভিটামিন ‘এ’ তে পরিণত হয়।

ইত্তেফাক/এবি