সিরাজগঞ্জ

আবাদি জমিতে নদী খননের স্তূপ, বালুচাপা কৃষকের স্বপ্ন

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৭

বছর খানেক আগেও নদীর পাড়ের আবাদি জমিতে চোখ জুড়িয়ে যেত ভুট্টা, বেগুনসহ নানান ধরণের ফসলের ক্ষেতে। সেই ক্ষেত ঘিরেই ব্যস্ত ছিল স্থানীয় কৃষকরা। জমিতে ফসল ফলিয়ে ঘুরতো তাদের জীবিকার চাকা। কিন্তু সেই জমিতে এখন কৃষকের ব্যস্ততা নেই, গজিয়েছে আগাছা।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ঝাটিবেলায় এলাকায় ফুলজোর নদী সংলগ্ন আবাদি জমিতে নদী খননের বালু স্তূপ করে রাখার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্যমতে নদী খননের বালুতে জমি নয়, যেন চাপা পড়েছে তাদের স্বপ্ন।

কৃষকরা জানান, কামারখন্দ উপজেলার ঝাটিবেলাই মৌজায় ফুলজোড় নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য নদী খনন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদী থেকে উত্তোলিত বালু স্তুপ করে রাখা হয় নদী পারের ব্যক্তি মালিকানা আবাদি জমির ওপর। পরে ওই স্তূপ করা বালু স্থানীয় ইজারাদার সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেন।

তবে প্রশাসন ও বালু মহালের ইজারাদারের মধ্যে চলমান আইনি জটিলতার কারণে বর্তমানে কৃষিজমির ওপর থাকা বালু সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে জমির ওপর বালু পড়ে থাকায় কৃষকরা তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। ফলে বছরে লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই চরের কৃষকরা।

অন্যদিকে ইজারাদার বলছেন, আবাদি জমির ওপর স্তুপ করে রাখা বালু সহজ পদ্ধতিতে দ্রুত সরিয়ে নিতে চান ইজারাদার।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও ইজারাদারের মধ্যে চলমান আইনি জটিলতার কারণে বালু সরানোর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিঘা বিঘা জমি চাষাবাদের বাইরে রয়েছে।

এতে একদিকে জমির মালিক ও কৃষকরা যেমন ক্ষতির মুখে পড়েছে, অপরদিকে ইজারাদার বালু সরিয়ে নিতে না পারায় তারাও লোকসানে রয়েছেন।

কৃষকদের তথ্য মতে, স্তূপ করা বালুর নিচে অন্তত ১০ জন কৃষকের প্রায় ১৫ বিঘা জমি রয়েছে। এসব আবাদি জমি থেকে বছরে পেয়ারা ২৫০ থেকে ৩০০ মণ, ভুট্টা ৭০ থেকে ১০০ মণ এবং বেগুনসহ অন্যান্য ফসল ৫০ থেকে ৭০ মণ উৎপাদন হতো। কিন্তু জমিগুলো বালুর নিচে পড়ে থাকায় আবাদ বন্ধ রয়েছে অন্তত দুই বছর ধরে। আর আবাদ বন্ধ থাকায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না ফসলগুলো। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষকরা।

জমির মালিক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জমির ওপর দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে রাখা হয়েছে। ফলে জমিতে কিছু করতে পারছি না। স্তূপ করা বালু সরিয়ে ফেললে আমরা কৃষিজমি কাজে লাগাতে পারব।’

আরেক জমির মালিক কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেখানে যে বালু স্তুপ করে রাখা আছে, সেই বালু ইজারাদার কিনেছে ঠিক। তবে বালুগুলো অন্যত্র পরিবহন করে নেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও দ্রুত বালু সরিয়ে নিলে আমাদের জন্য ভালো হবে।’

ইজারাদার মো. আতিকুর রহমান সোহাগ বলেন,

সাধারণ মানুষের ক্ষতি হোক, আমরা সেটাও চাই না। কৃষিজমি থেকে বালুগুলো তুলে নিতে চাই আমরা। তবে প্রশাসন সেটি বন্ধ রেখেছে। বালুগুলো সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেই আমরা সবকিছু সরিয়ে নেব। তাহলে সাধারণ কৃষকরা তাদের জমি ব্যবহার করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও চাই কৃষকদের জমি দ্রুত খালি হোক। আইনি জটিলতার কারণে এখন বালু সরাতে পারছি না। সুযোগ পেলে দ্রুত বালু সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এই ব্যাপারে প্রতিকার পেতে উপজেলা প্রশাসনে আবেদন করলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এ বিষয়টি সমাধানে সুপারিশ করা হবে।

কামারখন্দ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। এটি আদালতের বিষয়। তবে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এটিও সত্য। আশা করছি বিষয়টি আদালতে দ্রুত একটি সুরাহা হবে।’

ইত্তেফাক/এপি