বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

‘অছাত্রদের’ দখলে ছাত্রলীগের কমিটি

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৫৩

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি ‘অছাত্রদের’ দখলে। তবুও বিশেষ ছাত্রত্ব দেখিয়ে রাজনীতি করছেন তারা। সংগঠনের গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে কমিটিতে চার শতাধিক নেতাকর্মীকে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ নেতারই ছাত্রত্ব নেই। বাকিদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ ছাত্র। এমনকি কমিটিতে ‘ড্রপআউট’ ও বহিষ্কৃতরাও রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ছয় বছরে স্নাতক ও দুই বছরে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করতে পারবেন। স্নাতকোত্তর চূড়ান্ত পর্ব পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে হলের সিট ছেড়ে দিতে হবে। তবে কোনো শিক্ষার্থী আট বছরে পড়াশোনা শেষ করতে না পারলে উপাচার্যের বিশেষ বিবেচনায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তখন তিনি আর নিয়মিত ছাত্র হিসেবে বিবেচিত হবেন না। এছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে অবস্থান করতে পারবেন না।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও বিভাগীয় সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগ ছাড়া অধিকাংশ বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের (৪৬তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে। এমনকি কয়েকটি বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদেরও স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ফলে কয়েকটি বিভাগ ছাড়া ৪৭তম থেকে ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরাই কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ শিক্ষার্থী। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এখনো ৪১তম ব্যাচ থেকে ৪৬তম ব্যাচের অনেক শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। এদের বেশির ভাগই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটিতে ৪২তম ব্যাচের দুই জন রয়েছেন। এর মধ্যে সভাপতি এক জন। তিনি ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগে ভর্তি হন। সোহেল মাস্টার্সে ফেল করা বিশেষভাবে ছাত্র। এছাড়া ৪৩তম ব্যাচের ৩২ জন কমিটিতে রয়েছেন। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান লিটন একজন। তিনিও মাস্টার্সে ফেল করা বিশেষ ছাত্র। লিটন ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পোষ্য কোটায় ভর্তি হন। এছাড়াও কমিটিতে ৪৪তম ব্যাচের ৬৫ জন, ৪৫তম ব্যাচের ৭৯ জন ও ৪৬তম ব্যাচের ৯২ জন অছাত্র রয়েছেন।

এদিকে শীর্ষ পদগুলো ছাড়াও প্রায় ৩০০ নেতাকর্মীর ছাত্রত্ব নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটিতে সহসভাপতি রয়েছেন ১০৬ জন। এর মধ্যে প্রায় ১০০ নেতার ছাত্রত্ব শেষ, বাকিরা বিশেষভাবে ছাত্রত্ব ধরে রেখেছেন। আর যুগ্ম সম্পাদক রয়েছেন ১১ জন, যার সবার ছাত্রত্ব শেষ। এছাড়া অন্যান্য পদেও অনেক অছাত্র নেতা রয়েছেন, যারা অবৈধভাবে আবাসিক হলে থাকেন।

এর আগে ২০২২ সালের ৩ জানুয়ারি আকতারুজ্জামান সোহেলকে সভাপতি ও মো. হাবিবুর রহমান লিটনকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে হিসেবে এক বছর ৩৫ দিন আগে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণদের দিয়ে চলছে জাবি ছাত্রলীগ। এতে অবৈধ ছাত্রলীগের নেতারা হলের সিট দখল ও চাঁদাবাজিসহ নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘আমার জানামতে ছাত্রলীগের নেতারা বেশির ভাগই বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি আছে। অনেকে বিশেষ পরীক্ষা দিচ্ছে। তার পরও অছাত্র কেউ হলে থেকে থাকলে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দম্পতিকে কৌশলে ডেকে নিয়ে স্বামীকে মীর মশাররফ হোসেন হলের একটি কক্ষে আটকে রেখে পাশের জঙ্গলে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জড়িত ছিলেন। তিনি ছাত্রত্ব শেষ হলেও অবৈধভাবে এক বছরের বেশি হলে অবস্থান করছিলেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে হল থেকে অছাত্রদের বের করতে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ফলে জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অছাত্রদের হল থেকে বের করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অছাত্রদের বের করে বৈধ শিক্ষার্থীদের সিট বুঝিয়ে দিতে কয়েকটি হলে অভিযান চালিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আবার কিছু হলে শিক্ষার্থীদের কক্ষে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি হলে শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ তৈরি করছেন হল কর্তৃপক্ষ। তবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকায় ছাত্রত্ব শেষ হলেও অনেক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন হল কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, ‘অছাত্রদের বের করতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি। হল প্রশাসনকেও নির্দেশনা দেওয়া আছে। এটি বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব।’

চতুর্থ দিনেও বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস :এদিকে নারী ধর্ষণের ঘটনার বিচার দাবিতে চতুর্থ দিনের মতো গতকাল বিক্ষোভে উত্তাল ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন করেছেন সিনেটের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিরা। এ সময় রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অচলাবস্থা দূর করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের দাবি জানান। এছাড়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।

মানববন্ধনে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামছুল আলম সেলিম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নামে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু তার পরও তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। এসব ঘটনার বিচার দাবি করছি।’       
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির বলেন, ‘যারা ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের ফাঁসি দেওয়া হোক।’ এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমগীর কবীর, শেখ মনোয়ার হোসেন, আশিস কুমার মজুমদার প্রমুখ।

এছাড়া দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারসংলগ্ন সড়কে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং বহিরাগত ও অছাত্রমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষক অংশ নেন। মানববন্ধনে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রববানী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মদতে অছাত্ররা হলে বসবাস করছেন। তাদের বিতাড়িত করা ছাড়া কোনো সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।’

সিন্ডিকেট সভা স্থগিত: খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ পূর্ব নির্ধারিত ছিল। তবে সভাটি স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, ‘আমাদের প্রশাসনিক কিছু কাজ রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন করার জন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। কাজগুলো হলে পুনরায় সিন্ডিকেট সভার তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’

ইউজিসির কমিটি গঠন: ধর্ষণের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ ও সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কমিটিতে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মো. জামিনুর রহমানকে আহ্বায়ক, সহকারী পরিচালক মো. সেহজাদ রিফাত সিয়ামকে সদস্য সচিব ও উপপরিচালক মৌলি আজাদকে সদস্য করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমএএম