শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

তাহাদের ব্যাপারে পূর্বেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এক মাস অতিবাহিত হইয়াছে; কিন্তু এখনো এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া মারামারি ও হানাহানি বন্ধ হয় নাই। এইরূপ সংঘাত-সংঘর্ষ এখনো চলিতেছে কেন? এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া কোনো সংঘাত হইবার কথা ছিল না। কেননা এই বার অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হইয়াছে আওয়ামী লীগ-আওয়ামী লীগে বা শরিক তথা সমমনাদের সহিত। তাহার পরও ভোটের রেষারেষি ও হুমকি-ধমকির জের হিসাবে এখনো বিদ্যমান অস্থিরতা। সমগ্র দেশেই এমন অবস্থা বিরাজমান—এমন ঢালাও মন্তব্য আমরা করিতে চাহি না; কিন্তু কোনো কোনো এলাকায় সার্বিক পরিস্থিতি চলিয়া যাইতে পারে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াইয়া পড়িতেছেন; কিন্তু এই সকল দ্বন্দ্ব নিরসনে কাহারো কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলিয়া মনে হয় না। আমাদের প্রশ্ন, এই পরিস্থিতি আর কতদিন ধরিয়া চলিতে থাকিবে?

উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে সরকারি প্রশাসনে যখন দলীয়করণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখন এমন হতাশাজনক খবরের সন্ধান পাওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। এই কারণে বিশেষ করিয়া স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ এমনকি স্পর্শকাতর বিভাগের লোকজনও অনেক সময় দ্বিধাবিভক্ত বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়েন। দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে তাহারা তাহাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে পারেন না। ইহার সহিত অসততা, অসদুপায় অবলম্বন, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেও তাহারা একপ্রকার দলদাসে পরিণত হন। এই ক্ষতিকর প্রবণতা ও লেজুড়বৃত্তি দ্বারা কোনো দেশ যথার্থভাবে পরিচালনা করা যায় না। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-পাতি নেতাদের দাপটের নিকট অনেক সময় অসহায় হইয়া পড়েন। তাহারা সকল কিছু এমনভাবে ম্যানেজ করেন, যেন তাহারা এক একজন ট্রাইবাল চিফ বা গোত্রপ্রধান। ইহা একটি সামন্তবাদী বা আধা সামন্তবাদী সমাজের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। তাহাদের আচার-আচরণের কারণে স্থানীয় জনগণও অতিষ্ঠ হইয়া পড়েন; কিন্তু এই ব্যাপারে যথাবিহিত ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয় না—তাহাই এখানে বড় প্রশ্ন।

উপর্যুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এখনই যদি ইহার নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহা হইলে ইহার শেষ পরিণতি কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে তাহা কল্পনাতীত। মূলত ইহার জন্য দায়ী সরকারি দল ও প্রশাসনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মারিয়া থাকা একশ্রেণির বর্ণচোরা ও মুখোশধারী ব্যক্তি। যাহারা আসলে স্বাধীনতাবিরোধী তথা রাজাকার, আলবদর, আলশামসের উত্তরসূরি বা মতাদর্শী। তাহারা তোষামোদিতে সেরা। প্রকাশ্য চালচলন ও ব্যবহারে সরকারি দলের চাইতেও অধিক সরকারি, আওয়ামী লীগের চাইতেও অধিক আওয়ামী লীগ। তাহাদের ব্যাপারে পূর্বেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। গত নির্বাচনে যেই সকল অনিয়ম ঘটিয়াছে এবং ইহার পশ্চাতে প্রশাসনের যেই সকল ব্যক্তি কলকাঠি নাড়িয়াছেন, তাহাদের ও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে কাহার কী পরিচয়, সেই সম্পর্কে অনেকের অজানা ছিল না। তবে আমরা মনে করি, কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সরকারপ্রধানের অগোচরেই ঘটিয়াছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহারা গোয়েন্দা রিপোর্টকেও প্রভাবিত করিয়াছে।

আমরা পূর্বেও বলিয়াছি এবং এখনো বলিতেছি, ঐ পন্থির লোকজনের অনেকে এখনো প্রশাসনের উচ্চপদে বা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বহাল তবিয়তে রহিয়াছেন। সংঘাতপ্রবণ স্থানীয় এলাকার প্রশাসনকে তাহারা এখনো নিয়ন্ত্রণ করিতেছেন তাহাদের ইচ্ছামতো। এইমুহূর্তে তাহাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য না হইলেও এই পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহা হইলে তাহারা দেশ ও দশের আরো ক্ষতিসাধন করিতে থাকিবেন। ইহাতে নূতন করিয়া তৈরি হইতে পারে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। ইহা ছাড়া তাহারা যেইভাবে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সহিত জড়িত তাহা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছিয়া গিয়াছে। ইহার প্রতিও নূতন সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন মাদক কারবারসহ তাহাদের অবৈধ অর্থ উপার্জনের পথ বন্ধ করা। ইহা ব্যতীত এমন অস্থিরতা হইতে পরিত্রাণ লাভের আশা করা হইবে বাতুলতা মাত্র।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন