বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সিল মারতে গিয়ে ধরা পাঁচ প্রিজাইডিং অফিসার

পাকিস্তানের নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি

  • সহিংসতায় প্রাণ গেল পুলিশসহ ৯ জনের
  • মোবাইল, ইন্টারনেট সেবা ও সীমান্ত বন্ধ
  • পিটিআই এজেন্টকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
  • পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিলেন ইমরান খান
আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৪১

অনিয়ম, কারচুপি, সহিংসতা, মোবাইল, ইন্টারনেট সেবা  ও সীমান্ত বন্ধের মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠিত হলো ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়া পাকিস্তানের দ্বাদশ পার্লামেন্ট নির্বাচন। পাকিস্তান পার্লামেন্টের ২৬৫টি আসন ছাড়াও প্রাদেশিক পরিষদের ৫৯০টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির একটি আসন এবং তিনটি প্রাদেশিক আসনের ভোট স্থগিত করা হয়।

নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ যে জয় পাবেন সেটি আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, তার পেছনে যেমন সামরিক বাহিনী আছে, তেমনি প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রেরও হাত থাকতে পারে। নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এমনকি নির্বাচনের আগের দিনই বোমা হামলায় ২৮ এবং গতকালের হামলায় পুলিশসহ ৯ জনের প্রাণ গেছে। অথচ অধিকাংশ মানবাধিকার সংগঠন ছিল চুপ। অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের প্রায় দুই বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইমরান খানকে পরে দুর্নীতির অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং নির্বাচনে তার প্রার্থিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

কঠোর বিধিনিষেধেই ভোট

নির্বাচন নিয়ে খবর সংগ্রহের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রার্থী, প্রচারণা এবং মতামত জরিপের বিষয়ে কী বলা যাবে আর কী বলা যাবে না তা নিয়ে কঠোর নিয়মনীতি ছিল। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে এবং এসব নিয়মনীতি কার্যকর থাকে। এদিকে গতকাল খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে বোমা হামলায় ছয় পুলিশসহ ৯ জনের প্রাণ গেছে।

জালিয়াতির যে অভিযোগ

নওয়াজ শরিফের সরকারের একসময়ের সহযোগী পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) দাবি করেছে, পাঞ্জাবের একটি আসনের দার আকরাম স্কুলে পাঁচ জন প্রিজাইডিং অফিসারকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। তারা সবাই মিলে সিল মারছিলেন। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারা একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী বলে জানিয়েছে পিপিপি। তবে ঐ রাজনৈতিক দলের নাম জানায়নি পিপিপি। ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) জানিয়েছে, তাদের পোলিং এজেন্টদেরকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। এমনকি তাদের নির্বাচনি ক্যাম্পও ভেঙে দিয়েছে পুলিশ। পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের সর্বশেষ হাইকমিশনার (২০১৭-২০) অজয় বিসারিয়া বলেন, পাকিস্তানের নির্বাচনের কোনো নির্ভরযোগ্যতা নেই। এটা কোনোভাবেই সুষ্ঠু ভোট নয়। এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে পাকিস্তান সেনা বেশি মাথা ঘামায় না। ছোট ছোট দল এবং নির্দল প্রার্থীদের মাধ্যমে সেনা ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করে।

ভোট দিয়েও যে কারণে ভয়

ভোট দিয়ে স্বস্তিতে নেই পাকিস্তানের অনেক ভোটার। এদের মধ্যে একজন ৩৯ বছর বয়সি সৈয়দ তাসওয়ার বলেছেন, আমি ভোট দিয়েছি। কিন্তু আমার আশঙ্কা যে আমি যে দলকে ভোট দিয়েছি তার পক্ষে যাবে কি না। কারণ ভোট গণনায় কারচুপি করা হতে পারে। প্রথম বারের মতো ভোট দিয়েছেন ২২ বছর বয়সি হালিমা শফিক। তার আশঙ্কাও একই। তিনি চান, পাকিস্তানে নারীরা যেন নিরাপদ থাকতে পারে।

মোবাইল, ইন্টারনেট ও সীমান্ত বন্ধ

ভোটের দিনেই মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে এই সিদ্ধান্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হওয়ায় সাময়িকভাবে মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সম্প্রতি সন্ত্রাসবাদীদের তত্পরতা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও বিপদের মোকাবিলা করতে এই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ইমরান খানের দলের নেতা তৈমুর সেলিম খান ঝাগরা টুইট করে বলেছেন, মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করা খুবই লজ্জাজনক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে এবং মোবাইল পরিষেবা অবিলম্বে চালু করতে হবে। সাবেক পিপিপি সিনেটর মুস্তাফা নওয়াজ খোখার বলেছেন, ‘ভোটকেন্দ্রে কারচুপি নিশ্চিত করতেই মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।’ উল্লেখ্য, আগেই সরকার আশঙ্কা করছিল, পিটিআই কর্মীরা মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার পদক্ষেপ নিতে পারে। আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সীমান্ত পারাপারের জায়গাগুলো গতকাল বন্ধ রাখা হয়। এআরওয়াই নিউজ এবং জিও নিউজ নামক দুই জনপ্রিয় সংবাদ চ্যানেলকে ধমক দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। অভিযোগ, দুই চ্যানেলই ভোট চলাকালীন আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য লাইভ সম্প্রচার করেছে।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিলেন ইমরান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। ইমরান এখন জেলে আছেন। সেখান থেকেই তিনি ভোট দেন। ইমরান ছাড়াও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি, পাকিস্তান পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী চৌধুরী পারভেজ ইলাহি, আওয়ামি মুসলিম লিগের প্রধান শেখ রশিদ ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী ফায়াদ চৌধুরীও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেন। তবে ইমরানের স্ত্রী বুশরা বিবি ভোটে অংশ নিতে পারেননি। কারণ, পোস্টাল বয়ালট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। -ডন, উইও নিউজ, আরব নিউজ, এনটিভি ও হিন্দুস্তান টাইমস

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন