রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

মিয়ানমারের দুর্দশার পিছনে—

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:০০

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার বহু বত্সর ধরিয়া গোলযোগপূর্ণ। এই গোলযোগ শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে রূপ লইয়াছে। মিয়ানমার প্রমাণ করিয়াছে, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শাসন চাপাইয়া দিলে দেশে স্থিতিশীলতা আসে না এবং গোলযোগ এমন পর্যায়ে যায় যে, দেশ ভাঙিয়া যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়া বিস্ময়ের নহে। দুর্ভাগ্য, মিয়ানমারের মানুষের যে ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ বার্মা স্বাধীন হইবার পূর্বেই স্বাধীনতাসংগ্রামে লড়াই করা অং সান (অং সান সু চির পিতা) সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে নিহত হন। ইহার পর একটি দুর্বল গণতন্ত্র লইয়া মিয়ানমার স্বাধীন হয়। মজার ব্যাপার হইল, ১৯৫৮ সালে জেনারেল নেউইনের অধীনে দুই বত্সরের জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং তাহার অধীনেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসে; কিন্তু ১৯৬২ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল নেউইন ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারকে এককভাবে শাসন করেন। তিনি বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি করিয়া দেশটিকে সমাজতান্ত্রিক করিয়া তোলেন। প্রথমে সরাসরি সেনাশাসন থাকিলেও ১৯৭৪ সালে তিনি কনস্টিটিউশনাল ডিক্টেটরশিপ চালু করেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০০৮ সালে একটি সংবিধান রচনা করে যাহা ১৯৯০ সালের পর মিয়ানমারের জনগণকে ভোটের পথে টানিয়া আনে। সেই সংবিধান অনুযায়ী ২৫ শতাংশ আসন থাকিবে সেনাবাহিনীর জন্য, যা মিয়ানমারের মানুষ মানিয়া লইতে পারে নাই, তথাপি গণতন্ত্রের জন্য এক ধাপ আগাইয়াছিল। ২০১৫ সালে যে নির্বাচন হয় সেইখানে অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যদিও সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা ছিল, তথাপি তিনিই ছিলেন মিয়ানমারের ডিফ্যাক্টো নেতা; কিন্তু আবারও বিপত্তি ঘটে ২০২১ সালে, সেনাবাহিনী জেনারেল মিং অং লাইঙের নেতৃত্বে আবার ক্ষমতা দখল করিয়া লয়। এইবার মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী গোষ্ঠীগুলি একত্রিত হইয়া জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করিয়া দেয়। যদিও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতা আন্দোলন বহুদিন ধরিয়াই বিদ্যমান ছিল; কিন্তু তাহাদের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী পক্ষ একত্রিত হওয়ায় মিয়ানমার এখন প্রায় ভাঙিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। বাস্তবে মিয়ানমার সরকার বর্তমানে দেশের মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখিতে পারিতেছে বলিয়া পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হইয়াছে।

অন্যদিকে গণতান্ত্রিক বিশ্ব, বিশেষ করিয়া অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলি মিয়ানমারের এই অগণতান্ত্রিক আচরণ কখনোই ভালো চোখে দেখে নাই। এবং সর্বশেষ নির্বাচিত সরকারকে হঠাইয়া দেওয়ায় তাহারা আরো বিরাগভাজন হইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের উপর এই যাবত্ ১৯টি বড় নিষেধাজ্ঞা দিয়াছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০২২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিশেষ অধিবেশনের মাধ্যমে নিন্দা জানাইয়া রেজুলেশন পাশ করে। মিয়ানমারের সামরিক সরকার অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক এই সকল অসহযোগিতার ফলে অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত দুর্বল করিয়া তুলিয়াছে। একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে ভাতের অভাব মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উদ্যোগকে ভয়ানক শক্তিশালী করিয়া তুলিয়াছে। বর্তমানে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী এতটাই প্রতিরোধের মুখে পড়িয়াছে যে তাহাদের নিয়মিত সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা ভারত ও বাংলাদেশে পালাইয়া আশ্রয় লইতে শুরু করিয়াছে। এই রকম পরিস্থিতিতে মিয়ানমার টুকরা হইয়া গেলে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। অথচ স্বাধীনের পর সামরিক কর্মকর্তারা উচ্চাভিলাষী হইয়া না উঠিলে, গণতান্ত্রিক পন্থায় দেশ পরিচালনা করিতে দিলে নিশ্চয়ই মিয়ানমারকে আজিকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইত না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন