সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:১৭

চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পাকিস্তানে ১৬তম জাতীয় পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল। বলা বাহুল্য, ভোটের ফল আগে থেকেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। এই লেখা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলছিল এবং কে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসছেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায়নি। (যদিও কেউ কেউ নওয়াজ শরিফের পুনরায় ক্ষমতায় আসার আভাস দিয়েছেন।)

শুরুতেই উল্লেখ করা দরকার, নির্বাচনের আগে নানামুখী জল্পনাকল্পনার শেষ ছিল না। নির্বাচনে কে জিততে পারে—এই আলোচনা ছাপিয়ে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনির। মুনিরকে নিয়ে আলোচনা ঘুরপাক খাওয়ার কারণ, অনেকে মনে করেন, ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছেন তিনি। ঠিক এমন এক পটভূমিতে নির্বাচনের পর নতুন সরকারে মুনির কাকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাবেন, তার দিকেই দৃষ্টি রয়েছে সবার।

এই নির্বাচনে স্বভাবতই ‘টপ ইস্যু’ হয়ে ওঠেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পাকিস্তানের বৃহত্তম এই রাজনৈতিক দল নির্বাচন থেকে কার্যত বাদ পড়ে যায় আগেভাগেই। তবু চমকের শেষ ছিল না নির্বাচন ঘিরে। এই অর্থে বলা যায়, পাকিস্তানের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর এই নির্বাচন বিরাট প্রভাব ফেলবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের পর দেশের ক্ষমতার সমীকরণে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে? আরো জটিল প্রশ্ন, কীভাবে আসবে সেই পরিবর্তন? ইমরানের দল পিটিআই ভোটের বাইরে ছিটকে পড়ায় সমীকরণ মেলানো কতটা সহজ হবে, সেই প্রশ্নও ঘুরেফিরে আসছে।

নওয়াজ শরিফের ক্ষমতায় ফেরার মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছিল নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই। অবশ্য তিন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের পুনরুত্থানের গল্প পাকিস্তানের রাজনীতির আবহমান বাস্তবতা বই কিছুই নয়। যদিও নওয়াজের ক্ষমতায় আসা মানেই ‘খেলা শেষ’ নয়!

ভোটের আগ পর্যন্ত বিশ্লেষকেরা বলে যাচ্ছিলেন, চমক জাগানিয়া অনেক কিছুই ঘটতে পারে। বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটাভুটিতে অংশ নিলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে চলমান অচলাবস্থা কিছুটা হলেও প্রভাবিত হতে পারে। ব্যাপক হারে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে সমীকরণ পালটে দিতে পারেন তারা। এতে করে পালটে যেতে পারে সামগ্রিক রাজনৈতিক আবহ।

ভোটের আগে অনেকে জোর দিয়ে এমনও বলার চেষ্টা করেছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়লাভের মাধ্যমে ‘একটি বিখণ্ডিত ম্যান্ডেট’ পাকিস্তানকে রাজনৈতিভাবে ঠেলে দিতে পারে এক অজানা গন্তব্যের দিকে। সেক্ষেত্রে চতুর্থ বারের মতো নওয়াজের রাজমুকুট পরার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেতে পারে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের ক্ষণ, তথা ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের জন্য হয়ে ওঠে ‘গেম অব থ্রোনস’। ভোটের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজনীতিতে ‘এক নতুন অধ্যায়’ শুরুর অপেক্ষা চলে।

নির্বাচনের দিন কয়েক আগে কারাবন্দি করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে। বুশরা বিবির সঙ্গে বিধিবহির্ভূতভাবে বিবাহ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে। ইমরানের দলকে ছুড়ে ফেলা হয় নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে। তবে নির্বাচনে অংশ নিতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি ইমরানের দল ও সমর্থকেরা।

পাকিস্তানের রাজনীতি একের পর এক উত্তাপ ছড়ায় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে। মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইমরানকে তৃতীয় বারের মতো দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সাজা হিসেবে সর্বমোট ৩০ বছরের বেশি জেল হয়েছে তার। যদিও ইমরান ও তার দলের ভাষ্য, ‘এসব কেবলই সাজানো নাটক।’

ইমরানের বিরুদ্ধে যেসব বিষয়ে অভিযোগ গঠন করা হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে অবাক করেছে ‘বুশরা বিবির সঙ্গে বিবাহসংক্রান্ত ইস্যু’। এই অভিযোগে ইমরানকে দোষী সাব্যস্ত করার ঘটনা সমগ্র জাতিকে লজ্জিত করেছে। উপহাস করেছে ন্যায়বিচারকে। কোনো সন্দেহ নেই, এই মামলার রায় নির্বাচনের ওপর ব্যাপক ছায়া ফেলে।

অনেকে মনে করেন, ইমরানের বিরুদ্ধে যেসব শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য থাকতে পারে—পিটিআই ভোটারদের ভোট দিতে আসতে নিরুত্সাহিত করা। পিটিআইকে ভোটের মাঠের বাইরে রাখতেই এমন পরিকল্পনা!

বিপরীত ভাবনাও লক্ষ করা গেছে। ভোটের আগে অনেক বিশ্লেষক বলেছিলেন, ইমরানকে দোষী সাব্যস্ত করাটা হিতে বিপরীতও হতে পারে। কারণ, এর ফলে ইমরানের সংক্ষুব্ধ সমর্থকেরা ভয়ের প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে।

আমরা দেখেছি, সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে ইমরান-সমর্থকদের কাছে। ইমরানের ভোটাররা, বিশেষ করে যুবক ভোটাররা ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষভাবে লক্ষ করা গেছে, ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ করার মতো তেমন কোনো প্রচেষ্টা ভোটের আগের দিন পর্যন্ত স্পষ্ট না হলেও ভোটের দিন ঠিকই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুঠোফোন সেবা সাময়িক স্থগিত রাখা হয় দেশ জুড়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির’ কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সহিংসতা ও হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে ভোটের দিন। কুলাচি এলাকায় পুলিশের টহল দলকে লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হন পুলিশেল চার সদস্য। এর দিন দুয়েক আগে বেলুচিস্তান প্রদেশে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রায় ৩০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখা দেয়। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পাকিস্তানে যে কোনো নির্বাচনেই প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে পাঞ্জাব। জাতীয় নির্বাচনের সময় তো কথাই নেই। জাতীয় পরিষদের অর্ধেকেরও বেশি আসন রয়েছে এই প্রদেশে। তাছাড়া পাঞ্জাব হচ্ছে দেশের বৃহত্তম প্রদেশ। আর এ কারণে বাড়তি নজরের পাশাপাশি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় প্রদেশ জুড়ে। ব্যতিক্রম ছিল না এবারও। যদিও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে ইমরান সমর্থকদের অভিযোগ, পিটিআইসহ অন্যান্য ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমনমূলক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এমনকি পিটিআইয়ের নির্বাচনি অফিস ও দল সমর্থিত প্রার্থীদের বাড়িতে চালানো হয় অভিযান। শুধু তাই নয়, পিটিআইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা থেকে দূরে রাখার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে এ ধরনের দমনমূলক পদক্ষেপ মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে স্বভাবতই। পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসন কিংবা নির্বাচন কমিশন সব সময়ই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার কথা বলে আসছিলেন নির্বাচনের সময় জুড়ে। ফলে তাদের প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন মহলে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থেকে যায়।

অবাধ নির্বাচনের নিশ্চয়তা প্রদানকারী নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে ইসিপির ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এটা স্পষ্ট যে, নওয়াজের দল পিএমএল-এনের কাজ সহজ করার জন্য ভোটের মাঠ ‘পরিষ্কার’ করা হয়েছে। এই বিচারে, নওয়াজ শরিফের দল ভোটে জিতে ক্ষমতার মসনদে বসলেও তার প্রতি জনগণের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়।

মনে রাখতে হবে, নির্বাচনে ‘ভোট ম্যানিপুলেশন’ করে সব সময় প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না-ও হতে পারে। জনগণের সামনে ‘ইতিবাচক ফলাফল’ দাঁড় করানোর প্রচেষ্টাও সব ক্ষেত্রে কাজ করে না। কারণ, সবকিছুরই একটা সীমা আছে।

এই নির্বাচনে প্রতিটি প্রদেশের ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ, নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সব প্রদেশই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধর্তব্য হবে। এমন কিছু প্রদেশ রয়েছে, যেখানে পিটিআই তুমুল জনপ্রিয়। এসব অঞ্চলে নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষে ভোট পরিচালনা করা খুব একটা সহজ নয়। এমন বাস্তবতা যেহেতু সবার জানা, তাই কিছু প্রদেশে নিরাপত্তা সংস্থা তলে তলে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তা নিয়ে ভোটের আগে ছিল নানা কৌতূহল ও প্রশ্ন।

নজিরবিহীন কারসাজি ও প্রাক্-নির্বাচন কারচুপি সত্ত্বেও গতকাল ‘৮ ফেব্রুয়ারি’ ছিল পাকিস্তানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ, ভবিষ্যতে ইসলামাবাদের কপালে ঠিক কী আছে, তা ঝুলে ছিল এই দিনের ওপর। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন এভাবে—‘এবারের নির্বাচনে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে। নির্বাচনের অপ্রত্যাশিত ফলাফল নিরাপত্তা সংস্থাকে গুরুতর পরীক্ষার মুখে ফেলবে। ফলে ভোট কারচুপিই হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলোর তুরুপের শেষ তাস। তবে ভোটের পর জনগণ এসব কীভাবে গ্রহণ করবে, তাই আসলে বিবেচ্য বিষয়।’

লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

ডন থেকে অনুবাদ:সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন