সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

পার্চেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স প্রণয়নের উদ্যোগ

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:২০

অর্থনীতির চলমান গতি-প্রকৃতি নির্ধারণপূর্বক বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের ব্যাবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার লক্ষ্যে দেশে প্রথম বারের মতো পার্চেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং বেসরকারি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ এই সূচক প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত এমসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই নতুন সূচক প্রণয়নের উদ্দেশ্য ও কার্যকারণ সম্পর্কে অবহিত করা হয়। উন্নত দেশগুলোর অর্জিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, এ ধরনের সূচক প্রণীত হলে তা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান তথ্যের দুষ্প্রাপ্যতা অনেকটাই মেটাতে পারবে। ব্যক্তি খাতের ব্যাবসায়িক-উদ্যোক্তাগণ এই সূচকে বর্ণিত তথ্যাদি ব্যবহার করে তাদের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। পিএমআই মূলত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমীক্ষাভিত্তিক সূচক। কোম্পানির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামতের ভিত্তিতে এই সূচক প্রণীত হবে। 

পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স প্রকাশের ধারণাটি নতুন নয়। ১৯৪৮সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এ ধরনের সূচক প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দেশটির ইনস্টিটিউট অব সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। উদ্যোগটি বেশ কার্যকর ও ফলপ্রসূ বিবেচিত হওয়ার কারণে অন্য অনেক দেশ পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বর্তমানে এসএনবি গ্লোবাল নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী এই ইস্যু নিয়ে কাজ করছে। অনেক দেশে নিজস্ব উদ্যোগেও এই সূচক প্রণয়নের কাজ করছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ৪০টির বেশি দেশে এই সূচক প্রকাশ ও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এর আগে কখনোই এমন একটি সূচক প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পলিসি এক্সচেঞ্জকে পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স প্রণয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে যুক্তরাজ্যের ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কার্যালয়। পিএমআই প্রণয়নের ধারণা প্রদানসংক্রান্ত অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার ম্যাট ক্যানেল তার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের সব প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের উপকারে আসবে। তারা এই সূচকের তথ্য ব্যবহার করে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। এমসিসিআইয়ের সভাপতি বলেন, এই সূচকের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির হালনাগাদ পরিবর্তন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া যাবে। এতে সংশ্লিষ্টগণ উপকৃত হবেন। অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, দেশে বিভিন্ন খাতে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া বড় একটি চ্যালেঞ্জ। অনেকেই তথ্যের অভাবের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। মূলত এই সমস্যা সমাধানের জন্যই পার্চেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্ট (পিএমআই) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে কৃষি, নির্মাণ, উত্পাদন ও পরিষেবা—এই চার খাতের পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে পার্চেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্ট (পিএমআই) প্রণয়ন করা হবে। মাসিক ভিত্তিতে সূচক প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, পার্চেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্ট প্রচলিত জিডিপির বিকল্প কি না। এ ব্যাপারে আমাদের পরিষ্কার ভাষ্য হচ্ছে, পিএমআই কোনোভাবেই জিডিপির হিসাবায়নের বিকল্প কোনো পদ্ধতি নয়। পিএমআই শুধু একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত প্রদান করে, যা মোটেও জিডিপির হিসাবের সঙ্গে সমতুল্য নয়। জিডিপি হিসাব করা হয় পূর্ববর্তী বছরের ওপর এবং জিডিপিতে অর্থনীতির বিষদ বর্ণনা থাকে। অর্থাত্, এক বছরকে আওতায় বা বিবেচনায় নিয়ে জিডিপি হিসাবায়ন করা হয়। অন্যদিকে পিএমআই গত মাসের তুলনায় বর্তমানের ব্যাবসায়িক পরিস্থিতির এবং ভবিষ্যতে অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে বা যেতে পারে তার একটি পূর্বাভাস দেয়। প্রতিটি সেক্টরের কাঁচামাল আমদানি, পণ্য উত্পাদন ও বাজারজাতকরণ এবং মানবসম্পদের মতো সূচক বাড়ছে অথবা কমছে কি না, তার সঠিক চিত্র এর মাধ্যমে ফুটে উঠবে।

এর সাহায্যে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাগণ বিনিয়োগ ও উত্পাদন বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতি, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, কোন খাতে বিনিয়োগ করলে কেমন মুনাফা হতে পারে—এসব ইস্যুতে সঠিক তথ্য সময়মতো পান না। ফলে তারা বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। পিএমআই সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এক জন উদ্যোক্তা পিএমআইয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই বুঝতে পারবেন সংশ্লিষ্ট খাতের অবস্থা আগের মাসের তুলনায় ভালো না খারাপ হয়েছে।

 আমরা প্রাথমিকভাবে দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর নিয়ে কাজ শুরু করেছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, কৃষি, নির্মাণ, উত্পাদন ও পরিষেবা—এই চার ব্রড সেক্টরকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। আমাদের দেশের জিডিপিতে সার্ভিস সেক্টর বা সেবা খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫০ শতাংশ। তার মধ্যে হোলসেল, রিটেইল আর গাড়ি মেরামত সাব সেক্টরের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। এ রকম বেশ কিছু সাব সেক্টর যাদের জিডিপিতে অবদান বেশি, তাদের এই সূচকের আওতায় আনা হচ্ছে। এই সূচকের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সেক্টরের জন্য আলাদা পিএমআই প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

আপাতত তিন বছর এই কার্যক্রম যুক্তরাজ্যের ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এফএসডিও)-এর সহায়তায় বাস্তবায়ন করা হবে এবং সিংগাপুরের প্রতিষ্ঠান এসআইপিএমএম, যারা ২০ বছর যাবত্ সিংগাপুরে পিএমআই প্রণয়ন করছে। যদি আমাদের কর্মতত্পরতা দিয়ে পিএমআইকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এই সূচক ব্যাপক মাত্রায় জনপ্রিয়তা অর্জন করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। মূলত বেসরকারি খাতের কথা চিন্তা করেই আমরা পিএমআই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। তবে এক্ষেত্রে সরকারি খাতও উপকৃত হতে পারবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যারা এই কার্যক্রমের জন্য তথ্য প্রদান করবেন, তারা কি সব সময় সঠিক তথ্য প্রদান করবেন? আমরা যাতে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারি, সে জন্য তথ্য সংগ্রাহকদের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য যে প্রশ্নমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তা খুবই সহজ। মাত্র চার থেকে পাঁচ মিনিটে তথ্য প্রদান করা সম্ভব। যে কেউ এই প্রশ্নমালা পড়লেই বুঝতে পারবেন। আর যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন, তারা ভুল বা মিথ্য তথ্য দেবেন—এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। যারা তথ্য-উপাত্ত প্রদান করবেন, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে। তারা এই ব্যবস্থার বাস্তবতা ও উপযোগিতা অনুধাবন করতে পারছেন। আশা করি, তারা নিজেদের স্বার্থেই সঠিক তথ্য প্রদান করবেন। তথ্য পাওয়ার পর আমরা নিজেরা তার যথার্থতা বিশ্লেষণ করব। যদি মনে হয় যে, প্রদত্ত তথ্য-উপাত্ত সঠিক আছে, শুধু তাহলেই আমরা তা ব্যবহার করব।

পিএমআই চালু করার ক্ষেত্রে আমরা কিছুু সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করছি। যেহেতু পিএমআই দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারা, তাই সম্ভাব্য সেবাগ্রহীতাদের এর গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝানোর ক্ষেত্রে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে আমরা আশাবাদী যে, তারা অচিরেই এই পদ্ধতির সুফল সম্পর্কে বুঝতে পারবেন। আরো একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সময়মতো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা। অনেকেই হয়তো এর গুরুত্ব সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পেরে তথ্য প্রদানে বিলম্ব করতে পারেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা চারটি সেক্টর নিয়ে কাজ শুরু করেছি। প্রতিটি সেক্টরের জন্য একটি করে হেডলাইন ইন্ডিকেটর থাকবে। চারটি সেক্টরের হেডলাইন ইন্ডিকেটর দেখে বোঝা যাবে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়েছে না কমেছে। যখন উদ্যোক্তাদের কাছে প্রশ্নপত্র পাঠাব, তখন তিনটি অপশন দেওয়া থাকবে। ব্যবসার পরিধি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে না কমেছে, নাকি স্থিতিশীল আছে। যদি উত্তরদাতাদের সবাই বলেন যে তাদের ব্যবসার পরিধি বা অবস্থা আগের সময়ের তুলনায় বেড়েছে, তাহলে আমাদের ইনডেক্স রেটিং হবে ১০০। যদি সবাই বলেন, তাদের ব্যবসার অবস্থা আগের মতোই আছে, তাহলে ইনডেক্স রেটিং হবে ৫০। আর যদি দেখা যায় সবাই বলছেন গত মাসের তুলনায় ব্যবসা খারাপ হয়েছে, তাহলে ইনডেক্স রেটিং হবে শূন্য। যেহেতু পিএমআই আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা, তাই এটা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র ম্যানেজার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’
অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন