সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ‘ক্রলিং পেগ’-এর সফলতা কতটুকু

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

একটি বিনিময় হার ব্যবস্থা হলো কীভাবে একটি দেশ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে তার মুদ্রা পরিচালনা করে। একটি বিনিময় হার ব্যবস্থা সেই দেশের মুদ্রানীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তিনটি মৌলিক ধরনের বিনিময় ব্যবস্থা রয়েছে :ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ, ফিক্সড এক্সচেঞ্জ এবং পেগড ফ্লোট এক্সচেঞ্জ। সাধারণত ডলার বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে দু ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়—হার্ড পেগ ও সফট পেগ। হার্ড পেগ পদ্ধতিতে সরকার বৈদেশিক মুদ্রার মান নিজে ঠিক করে দেয় এবং সে অনুযায়ী লেনদেন হয়। আর সফট পেগ পদ্ধতিতে বাজারের ওপরে মুদ্রার মান ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে সরকার বা ব্যাংক চাইলে সফট পেগ পদ্ধতিতে ডলারের একটি সম্ভাব্য দাম ধরে দিতে পারে। এছড়া অনেক দেশে ডলারের মান সম্পূর্ণ বাজারমুখী রাখতে এবং হস্তক্ষেপবিহীন মান নির্ধারণে ‘ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট’ ব্যবহার করা হয়। এতে বাজার ও অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডলারের দাম ওঠানামা করে। এসব পদ্ধতির বাইরে অর্থনীতিতে নিজ দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন প্রকট আকার ধারণ করলে ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার মান নির্ণয় করা হয়। এই পদ্ধতিতে ডলারের একটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দাম ধরে দেওয়া হয়। এর ফলে না ডলারের দাম একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে, না আকাশচুম্বী আকার ধারণ করে। মূলত অস্থিতিশীল মুদ্রাবাজারে সমতা আনতে আপত্কালীন পদ্ধতি হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হয়।

টাকাকে রূপান্তরযোগ্য ঘোষণা করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৪ মার্চ। আইএমএফের চাপে ২০০৩ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকে ভাসমান করে বা বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়। তবে বিনিময় হার ভাসমান হলেও পুরোপুরি তা বাজারভিত্তিক থাকেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময়ই এতে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রেখে আসছে। অর্থাত্, বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে অনুসরণ করে আসছে ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং রেট’ নীতি। প্রকৃতপক্ষে টাকাকে কখনোই পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। আর কাজটি করেছে আন্তঃব্যাংক বাজারের রেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। বাংলাদেশের রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই টাকার মান ধরে রাখতে চেয়েছে। 

চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে মার্কিন ডলারের দাম নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ক্রলিং পেগ’ হলো কোনো দেশের স্থানীয় মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি। এটি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত নীতিরই অনুকরণ। এ নীতির মৌলিকত্ব হলো, কোনো মুদ্রার বিনিময় হারকে নির্দিষ্ট একটি সীমার মধ্যে ওঠানামার অনুমতি দেওয়া। অর্থাত্, কোনো দেশে ডলারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্য কত হবে, তার একটি রেঞ্জ ঠিক করে দেওয়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারজনিত অস্থিরতা তৈরি হলে এই সীমা ঘন ঘন সমন্বয় করা হয়। নিয়ন্ত্রিত বা বেঁধে দেওয়া বিনিময় হার থেকে উন্মুক্ত বাজারদরে প্রবেশের আগের ধাপটিই মূলত ‘ক্রলিং পেগ’। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবহারের ভিত্তিতে ক্রলিং পেগকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা—একটিভ ও পেসিভ পেগ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের উচ্চ ও নিম্ন সীমার একটি ব্যান্ড বেঁধে দিলে তাকে একটিভ ক্রলিং বলা হয়। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির হার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের হার নির্ধারণ করা হলে তাকে পেসিভ ক্রলিং বলা হয়। এর প্রাথমিক লক্ষ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ করা। ক্রলিং পেগ সিস্টেমের অনেক ঝুঁকি রয়েছে যেমন—কৃত্রিম বিনিময় হার তৈরি হয়; ফটকাবাজ, ফরেক্স ব্যবসায়ী এবং বাজারে ঝুঁকি তৈরি করে, যা মুদ্রা বিনিময়কে অস্থিতিশীল করে তোলে। অন্যদিকে ক্রলিং পেগির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ও কারসাজির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পেতে পারে।

তবে ঠিক কীভাবে এই পদ্ধতি কাজ করবে, তা এখনো ঠিক করতে পারেনি আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। জানা যায়, আগামী মার্চের মধ্যে এই পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পদ্ধতি চালু করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শরণাপন্ন হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য আইএমএফের একটি কারিগরি দল দেশে আসবে, এরপর তাদের পরামর্শে ঠিক হবে পদ্ধতিটি চালুর পথনকশা। ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতেই মূলত এই পদ্ধতিতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ঊর্ধ্ব ও নিম্ন সীমা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাফেদা থেকে বেঁধে দেওয়া হবে। ঐ সীমার মধ্যে থেকেই চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ডলারের দাম ওঠানামা করবে।

আইএমএফ সূত্রে জানা যায়, চীনের ভিন্ন নীতির কারণে নিকারাগুয়া ও ভিয়েতনাম ক্রলিং পেগ পদ্ধতি ব্যবহার করে, যাকে অনেকটা ‘বিলম্বিত পেগ’ বলে অভিহিত করা হয়। একসময় বতসোয়ানা, আর্জেন্টিনা, ইকয়েডর, উরুগুয়ে ও কোস্টারিকার মতো দেশগুলো পরীক্ষামূলক ক্রলিং পেগ নীতি অনুসরণ করলেও পরবর্তী সময়ে তা পরিত্যাগ করে। বাস্তবতা হলো, মুদ্রা বিনিময়ের একধরনের অস্থায়ী সমাধান। এই নীতি অনুসরণ করে ইসরায়েল যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছে। অন্য দেশ থাইল্যান্ডও একসময় এটি অনুসরণ করেছিল। আবার বিশ্বের অনেক দেশই এই পদ্ধতিতে সুবিধা করতে পারেনি। আর্জেন্টিনায় ইউএস ডলার দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার রিজার্ভ ২০১৬ সাল থেকে দেশটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। দেশটির মুদ্রা পেসোর মূল্যমান চরমভাবে হ্রাস পাওয়ায় ২০২৩ সালের মে মাসে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। পেসোর ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের পরও ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৮৩ পেসো পাওয়া যেত। কিন্তু দেশটির খুচরা ও কালোবাজারে প্রতি ডলারের বিপরীতে পাওয়া যেত প্রায় দ্বিগুণ অর্থ। এ অবস্থায় ডলারের বিনিময় হারকে পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে ‘ক্রলিং পেগ’ নীতি গ্রহণ করে আর্জেন্টিনা। কিন্তু এই হারও দেশের ডলারের সংকট দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮৮ সালে মেক্সিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রা পেসোকে ডলারের সঙ্গে পেগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে অপ্রত্যাশিত এক ঘোষণায় মেক্সিকোর মুদ্রা পেসোর অবমূল্যায়ন ঘোষণা করে এবং পরীক্ষামূলক ক্রলিং পেগিং বিনিময় হার চালু করে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু, এই পদ্ধতি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা অর্জন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো কঠিন করে তোলে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, হুন্ডি কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে কোনো নীতিই কাজে আসবে না। দেশে ডলারের সবচেয়ে বড় জোগান আসে প্রবাসী আয় থেকে। কারণ, প্রবাসীদের বৈধ পথে পাঠানো আয়ের পুরোটাই তাত্ক্ষণিকভাবে দেশে চলে আসে। আর রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আমদানি দায় পরিশোধে খরচ হয়ে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স আনতে সরকারের ২.৫ শতাংশ প্রণোদনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত দিচ্ছে আরো ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা। অর্থাত্, বৈধ পথে দেশে বৈদেশিক আয় পাঠালে মোট ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাবেন তারা। কিন্তু লক্ষণীয় যে প্রণোদনা সত্ত্বেও প্রবাসীরা বৈধ পথে তথা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আকৃষ্ট হচ্ছেন না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। হুন্ডিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাছাড়া, আমদানির ওভার-ইনভয়েসিং, রপ্তানির আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং রপ্তানি আয় দেশে ফেরত না আনার মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার বিদেশে পাচার হচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও টিউশন ফি এবং চিকিত্সার খরচও এখন হুন্ডিতে লেনদেন হয়।

আর্থিক খাতে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি চালু করার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘরের ডলার ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা। এই পদ্ধতি চালু হলে যারা অনেক বেশি লাভ করবেন বলে ডলার ধরে রেখেছেন, তাদের কোনো সুখবর নেই। কারণ ডলারের দর খুব বেশি না বাড়লে তারা কোনো লাভ করতে পারবেন না। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট এখন অনেক গভীর। এ অবস্থায় ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এই শঙ্কা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রলিং পেগ নীতির কথা বলছে। বিদ্যমান অন্যান্য পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু এই নীতি প্রবর্তন করা হলে তেমন সুফল মেলার আশা করা যায় না। এখন প্রয়োজন দ্রুত ব্যাংক খাতসহ আর্থিক খাতের কার্যকর সংস্কার করে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স যাতে বাড়ে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া।

লেখক: ব্যাংকার এবং ‘বৈদেশিক বিনিময় বাণিজ্য ও অর্থায়ন’ গ্রন্থের লেখক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন