রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

নির্বাচনোত্তর পাকিস্তানে অনিশ্চয়তা

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের তিন দিন পর অবশেষে ঘোষণা করা হইল ইহার ফলাফল। গতকাল প্রকাশিত এই ফলাফলে দেখা গিয়াছে, ২৬৪ আসনের মধ্যে সবচাইতে অধিক ১০১ আসনে জয়লাভ করিয়াছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাহাদের অধিকাংশই আবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের সমর্থক। ইহার পর পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ৭৫, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ৫৪, মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএম-পি) ১৭ ও অন্যান্য দল পাইয়াছে আরো ১৭টি আসন। মোট ২৬৬টি আসনের মধ্যে একটিতে ভোটগ্রহণ ও অন্যটিতে ফলাফল স্থগিত ঘোষণা করিয়াছে নির্বাচন কমিশন। এখন সরকার গঠন করিতে হইলে প্রয়োজন ১৩৪ আসন, যাহা কোনো দলই এককভাবে অর্জন করিতে পারে নাই।

উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করিয়া বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল লইয়া বিতর্ক এবং সরকার গঠনে জটিলতার কারণে পাকিস্তানে নূতন করিয়া অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। গতকাল ইমরান খানের সমর্থকেরা নির্বাচনি ফলাফল না মানিয়া করাচি, লাহোর, পেশোয়ার ও কোয়েটে বিক্ষোভ প্রদর্শন করিয়াছেন। পুলিশের সহিত তাহাদের সংঘর্ষও হইয়াছে। তাহাদের দাবি, দলীয় শীর্ষ নেতাদের ধরপাকড়, মিথ্যা ও সাজানো মামলায় শাস্তি প্রদান, দল নিষিদ্ধকরণ, দলীয় প্রতীক ছিনাইয়া নেওয়াসহ শত প্রতিকূলতার পরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তাহাদের ১৫০ আসনে জিতিবার কথা ছিল। ফলাফল ঘোষণায় কালক্ষেপণের মাধ্যমে কারচুপির আশ্রয় লওয়া হইয়াছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই নির্বাচন লইয়া প্রশ্ন তুলিয়াছে। ইহা তাহাদের পূর্ব অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত কি না, তাহাও বলা কঠিন। দ্বিতীয়ত, গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পিএমএল-এন ও পিপিপির মধ্যে জোট সরকার গঠনে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসে নাই। অনাস্থা ভোটে ইমরান খান সরকারের পতনের পর এই দুই দল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) গঠন করিয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়; কিন্তু এখন ক্ষমতার ভাগাভাগি লইয়া এই দুই দলের মধ্যে মতপ্রার্থক্য দেখা দিয়াছে। পিএমএল-এনের নওয়াজ শরিফ ও পিপিপির চেয়ারম্যান তরুণ রাজনীতিক বিলাওয়াল ভুট্টো উভয়েই প্রধানমন্ত্রী হইতে চাহেন। ইতিমধ্যে বিজয়ী ৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াজ শরিফকে সমর্থন জানাইয়াছেন। ইহাতে পিএমএল-এন ও পিপিপি মিলিয়া জোট সরকার গঠন করা সম্ভব; কিন্তু এই দুই দলের ক্ষমতা ভাগাভাগি লইয়া বিরাজমান দ্বন্দ্ব বাড়িতে থাকিলেও আমরা অবাক হইব না। এইদিকে কারাবন্দি ইমরান খান তাহার ভেরিফাইড এক্সে (টুইটার) তাহার দল ‘নিরঙ্কুশ বিজয়‘ লাভ করিয়াছে বলিয়া দাবি করিয়াছেন; কিন্তু সমস্যা হইল, পাকিস্তানি আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজেরা মিলিয়া সরকার গঠন করিতে পারেন না। জাতীয় পরিষদে সংরক্ষিত ৭০ আসনে কোনো সদস্যও দিতে পারেন না। এই জন্য পিটিআইয়ের নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ একটি মঞ্চ ঘোষণা করিতে পারেন। তাহারা কেন্দ্র, পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে গঠন করিতে পারেন প্রাদেশিক সরকার।

পিএমএল-এন ও পিপিপি যখন জোট সরকার গঠনে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা চালাইয়া যাইতেছে, তখন সেনাপ্রধান আসিম মুনির এক বিবৃতিতে বলিয়াছেন যে, সকল গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি ঐক্যবদ্ধ সরকারই ভালোভাবে দেশের বৈচিত্র্যময় রাজনীতি ও বহুত্ববাদের প্রতিনিধিত্ব করিতে পারে। এই কথা তিনি বলিতে না পারিলেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ও ভূমিকার কথা কাহারও অজানা নহে। অনেকে মনে করেন, তিনি এই কথা বলিয়া আসিলেও পিটিআইয়ের বাহিরে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠনের পরামর্শ দিয়াছেন। যদি ইহা ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে কী হইবে? গতকাল টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী পাকিস্তানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া দেশটিতে চারটি ঘটনা ঘটিতে পারে : পিএমএল-এনের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠন, পিটিআই সমর্থক সংসদ সদস্যদের ছোট একটি দলে যোগদানপূর্বক সংরক্ষিত আসনসহ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠন, পিপিপির নেতৃত্বে জোট সরকার গঠন, নতুবা কেহ সরকার গঠন করিতে না পারিলে অরাজকতার সুযোগ লইয়া পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল। পাকিস্তানের ৭৬ বত্সরের ইতিহাসে তাহারা তিন বার এইভাবে ক্ষমতা দখল করিয়াছে। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে তাহারা নওয়াজ শরিফের সরকারকে হটাইয়া ক্ষমতায় আসিয়াছিল। আবার সেনাবাহিনীর কলকাঠি নাড়িবার কারণে বেসামরিক সরকারের কোনো প্রধানমন্ত্রীই তাহার মেয়াদ পূর্ণ করিতে পারেন নাই। পাকিস্তানে সম্ভাব্য এই চার ঘটনার মধ্যে কোনটি ঘটিবে তাহাই এখন দেখিবার বিষয়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন