রাজধানীর স্বনামধন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এক ছাত্র জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়া, সংসদ ভবনের সামনে যে রাস্তাটা ‘মানিক মিয়া এভিনিউ’ নামকরণ করা হয়েছে, তিনিই ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া? তিনি আওয়ামী লীগের কী ছিলেন?’ এই হবু সাংবাদিকের এমন প্রশ্ন শুনে আকস্মিকভাবে চমকে গেলেও একেবারে অবাক হইনি। কারণ আমাদের দেশের সাংবাদিকতা বিষয়ক পাঠে এই মহান দিকপালের কথা কোথাও আংশিক কিংবা কোথাও একেবারেই অনুপস্থিত। যদিও বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তিনিই প্রথম অনুভব করেছিলেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের ভিত গড়ার পেছনে রয়েছে তাঁর বিশাল অবদান।
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন জাতীয়তাবাদ বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো শিল্পী, সবচেয়ে বড়ো কলমযোদ্ধা। রাজনীতি ও সাংবাদিকতার একটি অনন্য সেতুবন্ধ নির্মাণ করেন তিনি। তিনি ছিলেন মূলত রাজনীতিক, কিন্তু কার্যত সাংবাদিক। ১৯৬৮ সালের ১৯ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে মানিক মিয়া বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকতার প্রতি সুবিচার করতে হলে আমাদের মতো সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধির লোকদের একই সময় সাংবাদিকতা ও সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা চলে না।’ মূলত ১৯৫৩ সালে মানিক মিয়া সাংবাদিকতা জীবন গ্রহণের পর থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন, কিন্তু রাজনীতি থেকে মুক্ত ছিলেন না। প্রথমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী, পরে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধিকার আন্দোলনের সহযোগী। কিন্তু সরাসরি তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। দলের কোনো পদ নেননি। আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্রীয় কোনো সরকারের মন্ত্রিত্বের পদ গ্রহণ করেননি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মানিক মিয়াকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একটি পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি দলীয় রাজনীতিকের ভূমিকায় অবস্থান নেননি। তাঁর অবস্থান ছিল জাতীয় রাজনীতিতে; আরো ভালোভাবে বলতে গেলে বলা চলে, গণতান্ত্রিক জাতীয় রাজনীতিতে। সাংবাদিক হিসেবে মানিক মিয়া আরেকটি নামে পরিচিত ছিলেন ‘মোসাফির’। ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে লেখা যে কলাম বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে) গণজাগরণের ঝড় সৃষ্টি করেছিল, সেই কলামের লেখকের নাম মোসাফির। মানিক মিয়া পুরোদস্তুর রাজনৈতিক হলেও, মোসাফির কিন্তু রাজনৈতিক ছিলেন না। মানিক মিয়া ও মোসাফিরের মধ্যে একটি দ্বৈতসত্তা ছিল এবং তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
A gentleman is what his tailor makes of him. দর্জি যদি একজন ভদ্রলোক তৈরি করতে পারে তাহলে একটি দেশও যথার্থভাবে তৈরি হয় সাধারণ মানুষের হাতে, অতিমানবের হাতে নয়। তাই সাধারণ মানুষকে পাশ কাটিয়ে যে রাজনীতি তাকে আমি রাজনীতি বলে গণ্য করি না।’ মূলত এমনই ছিল তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শন। মানিক মিয়া রাজনীতিকে দেখতেন গণমানুষের অংশগ্রহণে একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান রূপে। রাজনীতিকে একটি পবিত্র ব্রত হিসেবে দেখতেন তিনি। তিনি মনে করতেন, দেশের মানুষের হিতাকাক্সক্ষা থেকেই এই ব্রত গ্রহণের প্রেরণা জন্মায়। রাজনীতিকে যারা আত্মোন্নতির বা ভাগ্যোন্নতির অবলম্বন বলে ভাবেন, তাদেরকে তিনি রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ বা কন্ট্রাক্টরি করতে বলেছিলেন। গণকল্যাণের রাজনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতিকে তিনি আলাদা করে দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনীতি সুনিশ্চিতভাবেই ক্ষমতা লাভের উপায় কিন্তু উদ্দেশ্য নয়। যাঁরা একে উদ্দেশ্য করে তোলেন তাঁরা ক্ষমতার রাজনীতি করেন, গণকল্যাণের রাজনীতি করেন না।’
নেপোলিয়ান বোনাপার্টের মতে, ‘এক লাখ সৈনিকের চেয়ে আমি তিনটি সংবাদপত্রকে বেশি ভয় করি।’ আর সংবাদপত্রের সম্পাদক যদি হন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মতো ক্ষুরধার কলম সৈনিক, তাহলে শাসকের ভয়ের পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। গণতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার মুক্ত গণমাধ্যম। সেই গণতন্ত্রের আদর্শ বা দর্শন প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের রূপকার বাংলার ছাত্র-জনতা, আর ভাষা আন্দোলন থেকে উৎসারিত জাতীয়তাবাদের মুখপত্র হিসেবে লড়াই করতে থাকে ইত্তেফাক। ৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার প্রচার করে এবং যুক্তফ্রন্টের মৌলিক দাবিগুলোকে গণমুখী করে ইত্তেফাক। মূলত যুক্তফ্রন্টের ইশতেহারকে নিয়ে পাকিস্তানি শাসনের একটি বিরোধী শক্তির আবির্ভাবের জন্য ব্যাপক জনমত তৈরি করে ইত্তেফাক, যা পাকিস্তানের পরাজয়কে অনিবার্য করে তোলে। ৫৮-এর আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে মানিক মিয়ার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তৈরি করে। ৬৬-তে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সবচেয়ে বড়ো সমর্থক ছিলেন মানিক মিয়া এবং মানিক মিয়ার ইত্তেফাক বাঙালির জাতীয় মুক্তির সনদ এই ছয় দফার সবচেয়ে বড়ো প্রচারপত্র ছিল। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে পশ্চিমা শাসকদের রাজনৈতিক পরাজয়ের সাথে সাথে নৈতিকতারও চরম বিপর্যয় ঘটে। এখানেও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় আবর্তনের মধ্যে মানিক মিয়া ছিলেন।
ষাটের দশকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি যেসব রাজনৈতিক কলাম দৈনিক ইত্তেফাকে লিখে গেছেন, তা পড়লে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কত তীক্ষè মেধা, সৎসাহস আর দূরদর্শিতা থাকলে একজন কলমযোদ্ধা তৎকালীন সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান তথা আমাদের নিরীহ মানুষের পক্ষে অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে পারেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মানিক মিয়া তাঁর মোসাফিরের কলামে ১৯৬৬ সালের জুন মাসে লেখেন, ‘মানুষের হাত-পা ভাঙ্গা অবস্থায় জীবন-ধারণ যেমনি যন্ত্রণাদায়ক, তেমনি বাক-স্বাধীনতা, সাধারণ নিরাপত্তা এবং সংবাদপত্রের অধিকার খর্বিত হইলে উহা মানুষের মনকে পীড়িত এবং সংবাদপত্র পরিচালনায় বিড়ম্বনাস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়। সংবাদপত্র যদি জনগণের সমস্যা, গণমনের জিজ্ঞাসা এবং দেশের চলতি ঘটনাপ্রবাহের উপর স্বাধীনভাবে খবরাদি পরিবেশন করিতে না পারে, সংবাদপত্রকে যদি বিধি-নিষেধ ও কড়া আইনের অনুশাসনের মধ্যে কাজ করিতে হয় তাহা হইলে সংবাদপত্র পরিচালনার কোনো সার্থকতা থাকে না। বিশ্বসুন্দরী কিংবা অর্ধ উলঙ্গ ছবি ছাপিয়া অথবা পাতায় পাতায় গুরুত্বহীন সংবাদের উপর বড় বড় টাইপের ব্যানার হেডলাইন আঁটিয়া কিংবা দেশীয় সমস্যা ছাড়িয়া বিদেশি সমস্যা নিয়া ঝুলাঝুলি করিয়া সংবাদপত্র জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে পরিচালিত করিবার নিষ্ফল চেষ্টা চালাইতে পারে। কিন্তু এই ধরনের সাংবাদিকতা করিয়া সংবাদপত্র দেশবাসীর আস্থা অর্জন এবং জনমতকে সুপথে পরিচালিত করিতে পারে না। সংবাদপত্রের উপর হামলা করা কিংবা সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করা ক্ষমতাসীন মহলের দুর্বলতারই প্রমাণ। কিন্তু ইহা জানিয়া-শুনিয়াও দুর্বল ক্ষমতাসীন দল অতীতেও এদেশের সংবাদপত্রের উপর হামলা চালাইয়াছে, আজিকার শাসকরাও সেই পথ অনুসরণ করিয়াছেন; বরং বর্তমান শাসককুলের থাবা আরও বড়।’ মানিক মিয়ার উপর্যুক্ত কথাগুলো আজকের প্রেক্ষাপটেও খুবই প্রাসঙ্গিক।
কলামিস্ট মোসাফির জাতীয় স্বার্থে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কলম চালিয়েছেন। দলের স্তুতি করেননি। আবার রাজনীতিক মানিক মিয়া গণরাজনীতি করেছেন এবং গণরাজনীতির সবচেয়ে বড়ো দল আওয়ামী লীগ তাঁর সমর্থন পেয়েছে, বলা চলে জোর সমর্থন পেয়েছে। এখানেই রাজনীতিক মানিক মিয়া ও সম্পাদক মোসাফিরের মধ্যে পার্থক্য। মানিক মিয়া ও মোসাফির একই ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তিনি দ্বৈতসত্তার অধিকারী ছিলেন। এখানে পক্ষ-নিরপেক্ষ কোনো ভূমিকা নয়। বাংলার স্বাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষের দল ও গোষ্ঠীকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। আর এখানেই মানিক মিয়া ও মোসাফিরের দ্বৈতসত্তার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মিল রয়েছে। তিনি ছিলেন গণরাজনীতি ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রথম ক্যাবিনেটে সংসদ ভবনের সামনের সড়কটিকে ‘মানিক মিয়া এভিনিউ’ নামকরণ করেন। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে মনে হচ্ছে মানিক মিয়া শুধু ওই নামকরণেই আটকে আছেন, তাঁর সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানার পরিধি খুবই কম এবং জানানোর উদ্যোগও নেই বললেই চলে। মানিক মিয়াকে আমরা কেবল সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছি। মানিক মিয়ার জীবনী, তাঁর কর্মতৎপরতা, সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার অবদান ইত্যকার ভাবনা-গবেষণায় আমাদের কোনো মৌলিক সংযুক্তি নেই। প্রথাগত নোট, কয়েকটি বই আর পেপার কাটিংকে সম্বল করে আমরা মানিক মিয়াকে বুঝি। আমি মনে করি, অন্তত দেশের ভবিষ্যৎ সাংবাদিকদেরকে অবশ্যই আরো ভালোভাবে মানিক মিয়া সম্পর্কে জানানো উচিত। কারণ বাংলাদেশে আজকের যে বিশাল গণমাধ্যম কাজ করছে, তার ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন মানিক মিয়া, তাই সেই ইতিহাস ছাড়া সাংবাদিকতা পাঠের কারিকুলাম কার্যত পূর্ণাঙ্গ হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংবাদিকতা পাঠের কারিকুলামের শুরুতে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের সেই ভিত গড়ার ইতিহাস, সেই কারিগরদের কথা উচ্চ কণ্ঠে বলতে হবে। কারণ সেখানেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রয়েছে। মানিক মিয়াকে জানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে, ধারণ করতে হবে আমাদের তথা গণমাধ্যমের স্বার্থেই।
প্রকাশ: ০১ জুন ২০১৮, ১৩:৫৪
