বাঙালির লুঙ্গিপ্রীতি

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:১৪

লুঙ্গি! বাংলাদেশের মানুষের বহুল ব্যবহৃত এক আরামদায়ক কিন্তু বিপজ্জনক বাঙালি পোশাক! এমন আরামদায়ক পোশাক সারা বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ! এর ভেন্টিলেশন সিস্টেম অত্যন্ত চমৎকার। তবে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বায়ুপ্রবাহ বিপদজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এর বাঁধন বা গিট্টু অত্যন্ত শৈল্পিক ব্যাপার। শীতের রাতে লুঙ্গি অনেক উপকারী বস্ত্র, যা দুর্বল গিট্টু-জনিত কারণে প্রায়শই মাফলারে পরিণত হয়। তবে প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বল গিট্টু-জনিত দুর্ঘটনা অত্যন্ত মানহানিকর এবং লজ্জাজনক। তাই লুঙ্গি জিনিসটার আরাম যত, বদনামও তত। আছে বেদনারও ইতিহাস।

জুতা আবিষ্কারের মতো লুঙ্গি আবিষ্কার নিয়েও একটা গল্প প্রচলিত আছে। এক রাজা গেছেন প্রজাদের সভায়। পরনে ছিল পাজামা। সভার মাঝখানে পেট মোচড় দিয়ে উঠলে গেলেন টয়লেটে। কিন্তু, পাজামার কোমরের বন্ধনী তাড়াতাড়ি খুলতে না পারায় ঘটে গেল বিপত্তি। এতে রাজা খেপে আগুন। তাৎক্ষণিক রাজ্যের প্রধান উজিরকে ডেকে পাজামার বন্ধনী সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার কঠোর নির্দেশ দিলেন। যেহেতু পাজামার গিঁট এত বড়ো দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, রাজার ইচ্ছে, বাকি জীবনে তিনি আর পাজামা পরবেন না। রাজার নির্দেশ বলে কথা! যেই কথা সেই কাজ। প্রধান উজির তাৎক্ষণিক রাজ্যের সব বিশেষজ্ঞ এক করে পাজামার এক বিকল্প খুঁজে বের করলেন। সেই বিকল্পের আধুনিক নাম ‘লুঙ্গি’, যাতে কোনো বন্ধনী বা রশি নেই।

এটা নিছক গল্প হলেও লুঙ্গির সূচনা হয় দক্ষিণ ভারতে। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুকেই এর জন্মস্থান বলা হয়। ভেস্তি নামের একধরনের পোশাককে লুঙ্গির উত্তরসূরি হিসেবে ধরা হয়।

মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে লুঙ্গির ব্যবহার হরহামেশাই। বঙ্গবন্ধু বাড়িতে লুঙ্গি পরতেন, ভাসানী পরতেন সর্বত্র। গান্ধীজির পরিধেয় সংক্ষিপ্ত ধুতি ছিল একান্তই শৈল্পিক, তবু সাম্রাজ্যবাদী চার্চিল গান্ধীকে বলতেন, ‘আধা-ন্যাংটা ফকির’। যেদিন থেকে পূর্বদেশীয় হাতিয়ার কোদাল বাংলার কৃষকের হাতে উঠে এল, সেদিন থেকে লুঙ্গি ছাড়া কৃষিকাজের আর উপায় ছিল না। একসময় পূর্ববাংলার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে পুরুষেরা লুঙ্গি পরে। যেমন একদা তারা ধুতিও পরত। ধুতি-লুঙ্গি তখনো জল-পানির মতো সম্প্রদায়গত হয়ে পড়েনি। এখনো দুই বাংলার অনেক হিন্দুবাড়িতে লুঙ্গির চল আছে। সে অর্থে লুঙ্গি, গামছা আর বদনার মতো ধর্মনিরপেক্ষ আর কিছু হয় না।

লুঙ্গি নারীরও পোশাক। তারপরও বিতর্কপ্রিয় বিশিষ্ট নারীবাদী তসলিমা নাসরিনের লুঙ্গিতে বেজায় আপত্তি। নায়িকা পরীমনি তাঁর জন্মদিনে লুঙ্গি ড্যান্স দিলে অবশ্য কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। লুঙ্গি মূলত সর্বলিঙ্গীয় পোশাক। লুঙ্গি উভচরও বটে। গ্রীষ্ম-বর্ষা আর কাদাপানির দেশে লুঙ্গি বিনা গতি নাই। কাদাপানির মাপ বুঝে যত ইচ্ছা তত ওপরে তোলা যায়। দরকার পড়লে নেংটি মেরে খাল-বিলে সাঁতরানো কিংবা মাছ ধরা যায়।

লুঙ্গির বিপরীত জিনিস সম্ভবত মানুষের কপাল। কারও কপাল খুললে পৌষ মাস, লুঙ্গি খুলে গেলে সর্বনাশ। ভাগ্যের গিঁট খুলতে হয়, লুঙ্গির গিঁট ভালো করে দিতে জানতে হয়। না জানলে ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, লুঙ্গি যে মোর যায় রে উড়ে’ দশা হতে পারে। এতে দোষ লুঙ্গির নয়, দোষ গিঁট দিতে না জানার। পুরান ঢাকা ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ আরো কিছু অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দামি লুঙ্গি পরে গদিতে বসার রেওয়াজ ধরে রেখেছেন আজো।

বাংলাদেশে সাধারণত বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরিধান করা না হলেও নকশা করা, বাটিক বা সিল্কের তৈরি লুঙ্গিগুলো অনেক সময় ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ের সময় বরকে উপহার দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। আবার অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও শিক্ষক ও ইমামদের লুঙ্গি উপহার দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। তবে এই আধুনিক সময়েও লুঙ্গি বাংলাদেশ, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে সমধিক জনপ্রিয়। সোমালিয়াতে অফিসের সময় বাদে অন্য সময়ে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ সবাই লুঙ্গি পরে থাকেন। তবে সেখানে লুঙ্গির সঙ্গে বেল্টও পরিধান করা হয়। লুঙ্গির প্রচলন আছে জাপানে। উৎসবের পোশাক হিসেবে সেখানে লুঙ্গি পরে। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় লুঙ্গিকে সারং বলা হয়। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, এই দুই দেশে লুঙ্গির ভেতর জামা ইন করে পরা হয়! সোমালিয়ার মতো তারা বেল্টও পরেন। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় লুঙ্গির প্রচলন বেশি দেখা গেলেও মালদ্বীপ, আফ্রিকার অনেক দেশ, পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ, ক্যারিবীয় অঞ্চল এমনকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও লুঙ্গি বেশ জনপ্রিয়। মিয়ানমারে লুঙ্গিকে লোঙ্গাই ডাকা হয়। লুঙ্গি মিয়ানমারের জাতীয় পোশাক। পুরুষরা এটি ঘরে-বাইরে সর্বত্রই পরে থাকেন। মহিলাদের লুঙ্গি এখানে তামাইন হিসেবে সুপরিচিত। ইয়েমেনে লুঙ্গিকে ডাকা হয় মা’আউস।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, স্বাধীনতার পর একসময় কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর, দোহার, নবাবগঞ্জ ও শ্রীনগরের হস্তচালিত তাঁতের (হ্যান্ডলুম) তৈরি লুঙ্গি প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রচালিত তাঁতে (পাওয়ারলুম) লুঙ্গি তৈরি শুরু হলে উৎপাদন বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বর্তমানে পাবনা, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর ও কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যন্ত্রচালিত তাঁতেই চাহিদার অধিকাংশ লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। সুতির চেক ও প্রিন্টের লুঙ্গির পাশাপাশি কারুকাজ করা জ্যাকেট লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে দেশে। লুঙ্গির সবচেয়ে বড়ো পাইকারি বাজার বসে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নরসিংদীর বাবুরহাট ও টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার তাঁতে বোনা লুঙ্গির সুনামও দেশ জুড়ে। সারা দেশে লুঙ্গির যে-কয়টি হাট রয়েছে, তার মধ্যে জয়পাড়ার লুঙ্গির হাট প্রসিদ্ধ। প্রায় ১০০ বছর আগে তাঁতে বোনা লুঙ্গির গোড়াপত্তন হয়েছিল এখানে। একসময় খুবই জমজমাট ছিল দোহারের জয়পাড়া লুঙ্গির হাট। রুহিতপুরি লুঙ্গি উপমহাদেশে বিখ্যাত। তাঁতের লুঙ্গি বেলকুচি উপজেলার অন্যতম ঐতিহ্য। বিশ্ববাজারে নরসিংদীর লুঙ্গির ব্যাপক কদর ও সমাদর। বাংলাদেশের লুঙ্গির দিকে এখন নজর বিদেশিদেরও। ব্যবসায়ীদের অভিমত, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের লুঙ্গির মান সবচেয়ে ভালো। এ কারণে রপ্তানিতেও অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এ কথা সত্যি যে, লুঙ্গি বাংলাদেশের ব্যাপক প্রচলিত সংস্কৃতি হলেও যারা সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা কিংবা ওঠাবসা করেন, তারা অনেকেই কিন্তু লুঙ্গির গিঁট দিতে জানেন না। কেননা তারা মনে করেন, তাদের কোমরে লুঙ্গি থাকলে জাত থাকবে না। রাজধানীর অভিজাত ঢাকা ক্লাবে লুঙ্গি পরে যাওয়া যায় না, দেশি সাহেবদের ইংরেজি সাহিত্যের আসরেও লুঙ্গি নিষিদ্ধ। লুঙ্গি নিয়ে বিব্রত হতে হয় গুলশান-বনানীর অভিজাত এলাকায়। কয়েক বছর আগে ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে রিকশাওয়ালাদের জন্য লুঙ্গির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় যুবসমাজ লুঙ্গি পরে ‘লুঙ্গি পদযাত্রা’ বের করেছিল, যা ‘লুঙ্গি মার্চ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরে অবশ্য হাইকোর্টের নির্দেশে লুঙ্গির ওপর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

পরিশেষে মূল কথা হলো, আত্মপরিচয় সংকটে ভোগা বাঙালিদের লুঙ্গি পরলে ইজ্জত চলে গেলেও, বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেবেরা লুঙ্গিপরা যুবকের কাছে মেয়ের বিয়ে দিতে না চাইলেও; লুঙ্গি থাকবে বহাল তবিয়তেই। লুঙ্গি ‘পোশাকের রাজা’ হয়ে বেঁচে থাকবে পুরুষদের মাঝে। কবি কায়সার হকের ভাষায় বলা যায়, ‘সমঝদারের কাছে লুঙ্গি হলো পূর্ণাঙ্গ এক ওয়্যারড্রোব; সাম্যবাদের কণ্ঠস্বর এবং দুনিয়াজুড়ে সর্বহারার প্রতীক।’ 

ইত্তেফাক/এসটিএম