এক প্রজন্ম আগেও প্রেমের প্রথম ধাপ মানেই ছিল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে, চত্বরে, আড্ডার ফাঁকে কিংবা নির্জন কোনো এক পরিসরে দুরু দুরু বুকে পছন্দের প্রিয় মানুষটিকে জানিয়ে দেওয়া মনের কথাটি। কখনো লজ্জা-দ্বিধা নিয়ে মুখোমুখি আবার কখনো বা ছোট্ট চিরকুট। তারপর হয়তো ক্যাম্পাস ছেড়ে পার্ক বা কফি শপ। প্রেম বলতে তখন ছিল ঈদ এলে প্রিয় মেয়েটির বাড়ির সামনে গিয়ে অকারণ হাঁটাহাঁটি বা বারান্দায় তাকে দেখে আড়চোখে তাকানো। তারপর অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে মন দেওয়া-নেওয়ার পালা। কিন্তু সময় বদলেছে। বর্তমান জেনারেশন জেড প্রেম করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এখন সম্পর্ক ভাঙা-গড়া সবই নির্ভর করছে একটি মাউসের ক্লিকের ওপর। নিমেষে বদলে যাচ্ছে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস। কখনো সিঙ্গেল থেকে ইন অ্যা রিলেশনশিপ আবার কখনো এনগেইজড থেকে সিঙ্গেল।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, ‘প্রেমের স্পর্শে প্রত্যেকেই কবি হয়ে ওঠে!’ মিলেনিয়াল প্রজন্ম পর্যন্ত মনে করা হতো, একটা কবিতা হলো হৃদয় থেকে নিঃসৃত হওয়া প্রেমের প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা। অন্তর্জাল ও ডিজিটাল বার্তার আধিপত্যের এ যুগে প্রেমের কবিতা লেখার মতো ‘সেকেলে’ প্রকাশভঙ্গিগুলো কি হারিয়ে গিয়েছে? এখনকার প্রজন্ম প্রেমের এসব জটিল আবেগগুলো কেমন করে প্রকাশ করে? তারা কি তাদের আগের প্রজন্মের অনেকের মতো কখনো শব্দ গুনে গুনে মোবাইল কোম্পানির দেওয়া ফ্রি মেসেজে কবিতা লিখে পাঠিয়েছে প্রিয়জনকে?
প্রযুক্তির উৎকর্ষে চিঠিপত্র এখন জাদুঘরের উপাদান হলেও একসময় পৃথিবী কাঁপানো মহানায়কেরাও প্রেমপত্র লিখেছেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট থেকে শুরু করে কবি কিটস, চার্চিল থেকে হেন্ড্রিক্সের সে প্রণয়প্রস্তাব চিরকালই রোমান্সের শ্রেষ্ঠ শিহরণ দিয়ে যাবে। ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে তারা যেমনই হোন না কেন, তাঁদের রোমান্টিক মন কিন্তু প্রেমিক কবিপুরুষের তুলনায় কোনো অংশে কম ছিল না।
এককালে সচিত্র প্রেমপত্র, চিঠি চালাচালির বই বিক্রি হতো রেল স্টেশন, ফুটপাতের দোকানে। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যোগাযোগের অনেক সহজ ব্যবস্থা করে দিলেও প্রেমপত্রের আবেগ এখনো দুর্মূল্য। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বাছুর কাছে গেলে গরুর বাঁটে আপনি দুধ জুগিয়ে আসে, তেমনি মনের বিশেষ বিশেষ রস কেবল বিশেষ বিশেষ উত্তেজনায় আপনি সঞ্চারিত হয়, অন্য উপায়ে হওয়ার জো নেই। পত্র মনের যে রস দোহন করতে পারে, কথা কিংবা প্রবন্ধ কখনোই তা পারে না।’
এই পত্র লেখাকে সাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের দিকপালেরা। চিঠির মাধ্যমে গড়ে উঠত বন্ধুত্ব। চোখে না দেখেও মাসের পর মাস শুধু কাগজে লেখা অক্ষরেই বেঁচে থাকত সম্পর্ক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রকাব্য মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’। আবার দেখি, নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেম সাহেব’ উপন্যাস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা পত্র। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পত্রটি লিখেছেন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের একজন নারী তার প্রেমিককে, ৩ হাজার ফুট লম্বা চিঠি লিখতে সময় লেগেছিল এক মাস।
ফ্যানি ব্রনকে লেখা জন কিটসের প্রেমপত্রগুলো অমর, অম্লান। বাংলা কবিতা ও গান ভরে আছে চিঠির নানান প্রসঙ্গে। কবি হেলাল হাফিজ ‘প্রস্থান’ কবিতায় লিখেছেনÑ
‘এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো।
এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তালপাখাটা
খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে পত্র দিয়ো।
ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত
ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো।...’
বর্তমান প্রজন্মের কাছে পত্র লেখা খুব ন্যাকা লাগে। কবিতা লিখে মেয়েদের ইনবক্সে পাঠালে ছেলেটা ‘ক্ষ্যাত’ ঘরনায় নিমজ্জিত হয়। লিখিত মাধ্যমে প্রেম প্রকাশের তুলনায় ফোনে কথা বলেই প্রেম বিনিময় করতে বেশি উৎসাহী এখনকার তরুণ প্রজন্ম। তবে গত বছরের প্রেম দিবসে ‘চ্যাটজিপিটি’-র হাত ধরে কিছুটা ফিরেছিল প্রেমপত্রের যুগ! যেসব তরুণের মনের কথা সুন্দর করে গুছিয়ে প্রেমপত্রে লিখতে অসুবিধা হয়, তারা নাকি ‘চ্যাটজিপিটি’র দ্বারস্থ হয়েছিল, লাভ কতটা হয়েছে সেটা তারাই বলতে পারবে।
সাধারণত, প্রেমে পড়লে ছেলে-মেয়েÑসবারই শরীরের ভেতরে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। যাকে ভালোবেসে ফেলেছেন, তার সঙ্গে কথা বলার সময় কিংবা তাকে ফোন করার আগে প্রচ- আবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এ অনুভূতিকেই ইংরেজিতে সুন্দর একটা ফ্রেজে বলা হয়-‘বাটারফ্লাইস ইন স্টোমাক’। বর্তমান প্রজন্মের পাকস্থলিতেও একই প্রক্রিয়ায় প্রজাপতি ওড়ে, কিন্তু তাদের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমগুলো বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন। এই দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে কলেজের প্রথম বর্ষের ফুলছাপ নীল সালোয়ার-কামিজের মেয়েটির ব্যাগে লুকিয়ে রেখে দেওয়া হলুদ পাঞ্জাবি পরা কেমিস্ট্রির ছাত্রটির লেখা তিন শব্দের প্রথম চিরকুট! কিংবা বই ধার নেওয়ার ছলে বইয়ের পাতায় যত্ন করে গুঁজে দেওয়া প্রথম প্রেমপত্র!
প্রেমপত্র প্রেমের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির প্রতিফলন। ডিজিটাল যুগে অনুভূত প্রেম বহুমুখী এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ক্ষণস্থায়ী। এসব কারণে প্রেমপত্র লেখার মতো বিষয় থেকে দূরেই থাকে এখনকার ছেলে-মেয়েরা, এমনটা মনে করেন অনেকে। আবার কেউ কেউ প্রেমপত্র লেখেনও বটে। ক্ষণস্থায়ী মিথস্ক্রিয়ার এ যুগে প্রেমপত্র মানুষের আবেগের নিরন্তর শক্তি এবং অবিরাম আকাক্সক্ষার একটি মর্মস্পর্শী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে, ভবিষ্যতেও করবেÑকাগজে, নয়তো ইনবক্সে।
এখন এক সেকেন্ডে মনের ভাব প্রকাশের পথে আসে না কোনো জড়তা। মোবাইল স্ক্রিনে টপাটপ মনের কথা লিখে ভালোবাসার মানুষটির কাছে পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে। পার হতে হচ্ছে না কয়েকশো কিলোমিটার রাস্তা, যেতে হচ্ছে না ডাকঘর অবধিও!
অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে সব কিছু। সম্পর্কের দূরত্বগুলো কাছাকাছি চলে এসেছে। অথবা হয়তো অনেক দূরে চলে গিয়েছে বেশি কাছে আসতে গিয়ে! কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে বেশ সুবিধাই যে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। নতুন করে লিখতে হয় না আর। সেভ করে রাখা কপি এডিট করে নেওয়া যায় খুব সহজেই। তারপর তা চটজলদি পাঠিয়ে দেওয়া যায় নির্দিষ্ট জায়গায়। এর পরের পর্বে সম্পাদনা বা প্রকাশনার কাজেও নতুন করে টাইপ করার দরকার পড়ে না, প্রাপ্ত ওয়ার্ড ফাইলেই ছুরি-কাঁচি চালানো যায়। সময় ও পরিশ্রমের বিশাল সাশ্রয় হয়।
এসব সুবিধার পরেও কোথাও মনে হয়, সারাদিন কি-বোর্ড, ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, মোবাইল স্ক্রিনের তীব্র আলোর চেয়ে পড়ার টেবিলের সাদা খাতার পাশে রাখা বেতের নকশা করা ল্যাম্পের কোমল আলোটা যেন অনেক বেশি ভালো ছিল! বেশি কাছের ছিল যেন হস্তশিল্প মেলা থেকে কেনা বিছানার পাশে রাখা পোড়া মাটির ল্যাম্পশেডটা, যার মৃদু আলোয় সদ্য মনে আসা ভাবনা শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিত সামনের খোলা সাদা পাতায়!
