মধু-ফাঁদে পা!

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:২৫

‘হানি ট্র্যাপ’ শব্দ যুগলকে দেখে ভ্রু কুঁচকানোর দরকার নেই। শিরোনামের বাকি অংশ দেখে আপনি যা ভাবছেন ঠিক তাই আসলে বোঝাচ্ছে এই শব্দ দুটি। কিন্তু এই ট্র্যাপ তথা ফাঁদ সাধারণ কোনো উদ্দেশ্য কিংবা নিছকই মজা করার উদ্দেশ্যে পাতা হয় না। বরঞ্চ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি হতে পারেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গোয়েন্দাসহ যে-কেউ, মূল্যবান কোনো তথ্য কিংবা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন চাতুর্যপূর্ণ ফাঁদ পাতা হয়ে থাকে। বর্তমান দুনিয়ার হালচাল সম্পর্কে অবগত থাকলে এমন ঘটনা আপনার কাছে নতুন কিছু হবার কথা নয়।

সাহিত্যে ‘হানি ট্র্যাপ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৭৪ সালে বের হওয়া ‘টিঙ্কার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ নামে এক গোয়েন্দা উপন্যাসে। ব্রিটিশ-আইরিশ লেখক জন লে ক্যারের এই উপন্যাসে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল বলে বিভিন্ন লেখাপত্রে পাওয়া যায়।

হানি ট্র্যাপ একধরনের অপকৌশল। বাংলা অনুবাদে একে ‘মধু-ফাঁদ’ বা ‘ভালোবাসার ফাঁদ’ নামে অভিহিত করা যেতে পারে। সহজ কথায়, এটা হলো যৌনতার প্রলোভন দেখিয়ে বিপক্ষ শিবির থেকে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি। যৌনতা ও শারীরিক সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে কাজ সমাধা করে নেওয়ার নামই হানি ট্র্যাপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধকালে হানি ট্র্যাপে ফেলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিমাদের কাছ থেকে গোপন তথ্য জানার চেষ্টা করেছে। মস্কোর কাছ থেকে তথ্য হাতিয়ে নিতে একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে পশ্চিমারাও।

হানি ট্র্যাপের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে এসেছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নাম। পরমাণু শক্তিধর আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধেও হানি ট্র্যাপে ফেলে পরস্পরের তথ্য হস্তগত করার অভিযোগ রয়েছে। হানি ট্র্যাপের মধ্য দিয়ে কখনো কখনো সত্য বেরিয়ে আসে, আবার নিরপরাধ লোক ক্ষণিকের ভুলে ফেঁসেও যেতে পারে। হানি ট্র্যাপ এমন একটা ফাঁদ, যা এড়ানো কঠিন।

বিশ্বে এমন অপরাধের ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। পাশের দেশ ভারতে এমন প্রতারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ভিন্নমাত্রা পেয়েছে এ অপরাধ। মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে ভারতীয় সুন্দরী তরুণীরা বাংলাদেশিদের এ ‘মধু-ফাঁদে’ ফেলছেন। দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, স্বনামধন্য সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তারা এ ফাঁদে পা দিয়ে খুইয়েছেন লাখ লাখ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকার অঙ্ক কোটি ছুঁয়েছে।

এক অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে মূলত দুটি উপায়ে হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিতদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একটি চক্র বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল এবং ভারতের প্রতারক চক্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। অপর অংশটি সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশি প্রতারক চক্রের মাধ্যমে। যৌনতা ও শারীরিক সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় তাদের কাজ হলেও একপক্ষের সঙ্গে অপরপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশি প্রতারক চক্রে আনুমানিক ৩০-৩৫ জন সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়/সাতজন তরুণী ও মধ্যবয়স্ক নারী। এ চক্রের নারী সদস্যরা রাজধানীর নাইট ক্লাব, তারকা হোটেলের বার ও নামীদামি ক্লাবগুলোতে যাতায়াত করেন। সাধারণত এসব জায়গায় বিত্তশালীরা যান। তরুণীরা বিত্তশালী ও বিবাহিতদের টার্গেট করেন। কারণ, তারা তাদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষার্থে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। তরুণীরা বেশ কয়েকদিন ধরে বিত্তশালীদের টার্গেট করেন। এরপর তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেন, মদ খান। অনেক সময় পৃথক রুমে সময় কাটান। সম্পর্কের দুই/তিন সপ্তাহ পার না হতেই তরুণীরা ওই ব্যক্তিকে একসঙ্গে রাত কাটানোর প্রস্তাব দেন। রাত কাটানোর জন্য ফার্মগেট, মতিঝিল, পল্টন ও নবাবপুর এলাকার নিম্নমানের হোটেল বেছে নেন তারা।

ওই ব্যক্তিকে নিয়ে তরুণী যখন হোটেলে যান তখনই সেখানে হানা দেন ভুয়া ডিবি অফিসার, সাংবাদিক কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট। অস্ত্রের মুখে তাদের দিয়ে জোর করে নগ্ন ছবি তোলা হয়, ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর বারবার সেই ভিডিও দেখিয়ে বিত্তশালী ওই ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করেন চক্রের সদস্যরা।

এ চক্রের সদস্যদের উপস্থিতি বেশি লক্ষ করা গেছে রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা হোটেল, রিনাইস্যান্স হোটেল, হোটেল সেরিনা, উত্তরা ক্লাব ও লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবের মতো কিছু সংরক্ষিত জায়গায়। সেখানে গিয়ে তরুণীদের সঙ্গে পরিচিত হন ভুক্তভোগীরা।

তানজিনা আক্তার ইভা (মাহি)। ৩৪ বছরের এ যুবতীকে বাংলাদেশে হানি ট্র্যাপে ফেলা অপরাধী চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই যুবতী নিজেকে মডেল মাহি নামে পরিচয় দেন।

জিজ্ঞাসাবাদে মাহি জানান, নিজের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম পেজে তিনি নিজেকে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পাস করে যুক্তরাজ্যের একটি আইটি ফার্মে কর্মরত হিসেবে পরিচয় দিতেন। পাশাপাশি ফেসবুকে নিজের আবেদনময় ছবি ও টিকটকে ভিডিও পোস্ট করতেন। উচ্চবিত্তদের টার্গেট করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে ফেলতেন প্রেমের জালে। পরে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও, অডিও ও ভিডিওতে হওয়া কথোপকথন রেকর্ড করে ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত হানি ট্র্যাপের মতো কতটি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এবং এ সংক্রান্ত কোনো গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ পায়নি। তবে, বাংলাদেশের সাইবার অপরাধের প্রবণতা নিয়ে ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের মাত্রা বেড়েছে ২৮১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। দেশে যারা সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়েছেন, তাদের ১৫.৪৭ শতাংশকে অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইলসহ নানাধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৯.১২ শতাংশ ভুক্তভোগীকে পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে হয়রানি করা হয়েছে।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের পুলিশের সহায়তা চাইতে চরম অনীহা। ২০১৮ সালের জরিপে যেখানে অভিযোগকারীর শতকরা হার ছিল ৬১ শতাংশ, ২০২৩ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশে। পুলিশের কাছে না যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়ার আশঙ্কা’র কথা বলেছেন অনেকে।

বিশ্বে হানি ট্র্যাপের কিছু আলোচিত কাহিনি
ভদ্রলোকের নাম মরদেচাই ভানুনু। তিনি একজন ইসরায়েলি টেকনিশিয়ান। কাজ করতেন দেশটির দিমোনা পারমাণবিক ক্ষেত্রে। ১৯৮৬ সালে তিনি আচমকা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের কাছে গিয়ে দাবি করলেন, ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক বোমা আছে। নিউজটি ব্রেকিং, তবে সত্যাসত্য যাচাইয়েরও দরকার আছে। আবার ভানুনু যে পদে আছেন, তাতে খবরটি উড়িয়েও দেওয়া যায় না।

এমন অবস্থায় ব্রিটিশ দৈনিক ‘সানডে টাইমস’ ভানুনুকে লন্ডনে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এই বন্দিজীবন তাঁর ভালো লাগে না। তিনি লন্ডনের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে লাগলেন। এমন সময় ভানুনুর সঙ্গে পরিচয় ঘটল এক সুন্দরী তরুণীর। পরিচয় থেকে প্রণয়। তাঁরা ডেটে যেতে চাইলেন। তবে লন্ডনে নয়, রোমে। ‘সানডে টাইমস’ কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রেমযাত্রায় বাধা দেওয়া সংগত মনে করেনি।

ভানুনু রোমে পৌঁছানোর পর আটক হলেন মোসাদ এজেন্টদের হাতে। জোরপূর্বক শরীরে নেশাজাতীয় দ্রব্য প্রয়োগ করে জাহাজে করে সোজা তাঁকে নিয়ে আসা হলো তেল আবিবে। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে কারাদ- হলো ১৮ বছর। ২০০৪ সালে মুক্তি মিলল তাঁর। তবে এ মুক্তিও একধরনের কারাগারের মতোই। এখানে যাওয়া যাবে না, ওর সঙ্গে কথা বলা যাবে না -এমন বিধিনিষেধের জালে বন্দি ছিল তাঁর জীবন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভানুনু যাঁর প্রেমে মত্ত হয়েছিলেন, সেই তরুণী ছিলেন মোসাদেরই এজেন্ট। চেরিল বেন টভ ওরফে সিন্ডি নামের সেই তরুণী যখন ভানুনুর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করছেন, তখন তিনি বিবাহিত। কিন্তু ভানুনু কিছুই বুঝতে পারেননি। হানি ট্র্যাপের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে এ ঘটনাকে সামনে আনা হয়।

দুনিয়াজোড়া হানি ট্র্যাপের গল্পের যেন শেষ নেই। মাতা হারির গল্পটা বলতেই হয়। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। মাতা হারি ছিলেন একজন ডাচ নৃত্যশিল্পী। বসবাস ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার জন্য চলে গিয়েছিলেন প্যারিসে। অভিযোগ ওঠে, খ্যাতনামা ফরাসি রাজনীতিবিদদের প্রলুব্ধ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে নিতেন তিনি। আর তা সরবরাহ করতেন শত্রুপক্ষ অর্থাৎ জার্মানদের কাছে। একসময় তিনি ধরা পড়ে যান। ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর ফায়ারিং স্কোয়াডে তাঁর মৃত্যুদ- কার্যকর করে ফরাসি সরকার। প্যারিসে তাঁর বিচার চলার সময় একজন আইনজীবী মাতা হারির কার্যক্রমকে ‘হানি ট্র্যাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।   

ইত্তেফাক/এসটিএম