গালি বিষয়ক গালগপ্পো

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩৮

ঢাকার আদি বাসিন্দাদের গালি দেওয়ার স্বভাব অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। তারা নাকি বাপের নামের আগেও ‘শ্যালক’ সম্বোধন যোগ করে। আর নিজের প্রসঙ্গে বলতে হলেও বলে ‘আমি হা...’। পুরান ঢাকার গালির ভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও রসপূর্ণ। গালি, এক আজব জিনিস। এ জিনিসটা মুখে উচ্চারিত হয়। কিন্তু ফলাফল হয় ভয়াবহ। মুখের জিনিস আর মুখে থাকে না। এর এমনই ঝাঁঝ, মানুষের হাতেও মাঝেমধ্যে অস্ত্র উঠে আসে।

ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনার পা আটকে গেল, আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই সবচেয়ে নম্র-ভদ্র লোকটির মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি। এটা প্রায় মানুষের রিফ্লেক্স বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মতোই হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছেন, একটা অশিষ্ট গালি দিয়ে আমরা এত আরাম বোধ করি কেন? এটা কি আমরা জেনে বুঝেই করি, নাকি আমরা যখন অশিষ্ট ভাষা ব্যবহার করি তখন আমাদের মস্তিষ্কে এবং দেহে সত্যি কিছু একটা পরিবর্তন ঘটে?

আমরা হোঁচট খেয়ে পায়ের আঙুলে ব্যথা পেলাম, বা রাস্তায় আপনার গাড়িকে আচমকা বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করে চলে গেল আরেকটা গাড়ি, অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি, বারোটা বেজে গেল মেঝের। এবং সাথে সাথেই আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এল ‘ছাপার অযোগ্য’ একটা গালি।

এ রকম পরিস্থিতিতে আমরা প্রায় সহজাত প্রবৃত্তির মতোই বেছে নিই একটা বা একগুচ্ছ অশ্লীল শব্দ, আর সেগুলো মুখ দিয়ে উগরে দেবার সাথে সাথেই প্রায় জাদুমন্ত্রের মতোই আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি।

আমরা মেনে নিচ্ছি, সবাই এক রকম নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলে গালি দেয়Ñএমন লোকও আছে। কিন্তু এটা অন্তত মেনে নিন যে, সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়।

চলুন জেনে নিই, গালি নিয়ে গুগল কী বলে। ক্রিয়া বা ভার্বের ক্ষেত্রে Attack (someone) using abusive language। এখন বুঝতে হবে অ্যাবিউসিভ জিনিসটা কী। এটি মূলত আপেক্ষিক। মনে করেন, একজনের কাছে ‘ছাগল’ শব্দটা অ্যাবিউসিভ, তাকে আপনি ‘ছাগল’ বললে খেপে যাবে। আবার আরেকজনের কাছে ‘ভালো’ শব্দটা অ্যাবিউসিভ। তাকে ‘ভালো’ বললে সে খেপে যাবে।

গালি হলো মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। অনেক না বলা ভাবও গালির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। কে জানি বলেছিল, ‘কোন ভাষা কত সমৃদ্ধ তা বোঝা যায় সে ভাষার গালি-সম্ভার দেখে।’ আমার জানামতে চীনদেশে গালি নিয়ে ডিকশনারি পর্যন্ত আছে।

আমরা সবাই জানি, ভাষা প্রবহমান। গালি যেহেতু ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ সেহেতু গালিও প্রবহমান। কালের প্রবাহে গালিরও পরিবর্তন হচ্ছে। ইদানীং মজার মজার বেশ কিছু নতুন গালি আবিষ্কৃত হয়েছে। খাপো। একনজরে বোঝা না-ও যেতে পারে যে, এটা কোনো গালি হতে পারে। মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার মডারেশন প্যানেলের হাত থেকে বাঁচতেই অভিনব এই গালি। এটি মূলত খা*কির পো*র সংক্ষিপ্ত রূপ। এবার ধরেন আবাল। একপ্রকার গরু। প্রব্লেম হলো, কাউকে যদি বলা হয়, ‘তুই গরু’ তাহলে সে মাইন্ড যতটুকু করবে ‘তুই আবাল’ বললে এর থেকে বেশি মাইন্ড করবে। অথচ দুটোই একই প্রাণী।

আমাদের দেশের গালিগালাজে যুক্তির ব্যবহার খুব একটা থাকে না। কারো প্রতি রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশের জন্যই সবসময় গালি ব্যবহার হচ্ছে না। অবস্থা হয়েছে এমন, ‘রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, একজনকে দেখলাম, একটা গালি দিয়ে দিলাম।’ এমন পরিস্থিতি আরো সহজে সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের সৌজন্যে। এসব প্ল্যাটফর্মে কথা বলতে যেহেতু পকেটের পয়সা খরচ হয় না খুব বেশি এবং যে-কাউকে হাতের আঙুলের নাগালে পাওয়া যায়, তাই কোনো কারণ ছাড়াই যে-কাউকে গালি দেওয়ার একটা প্রবণতা গড়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জনপ্রিয় যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। আর সবচেয়ে কুৎসিত রূপটি দেখার জন্য যেকোনো জনপ্রিয় বা ‘সেলিব্রেটি’ ব্যক্তির ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম পেজ ঘুরে আসা যায়। ঘুরে আসা যায় কোনো সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজের ফিড থেকেও। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, কী অবলীলায় চলছে গালির মহোৎসব! গালি দেওয়া সেখানে ওয়ান-টু’র ব্যাপার।

অবশ্য এ দেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গালি দেওয়ার জন্য তুচ্ছ কারণও লাগে না। গালি, অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহার এবং কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা রটানো এখানে খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কখনো যদি ভদ্রোচিত উপায়েও কেউ এর প্রতিবাদ করেন, তবে তো কথাই নেই। সব ধরনের গালি ও অশ্রাব্য কটু শব্দের তির তখন ওই প্রতিবাদকারীর দিকে ধাবিত হয়।

সমাজের মানুষের গালির ব্যবহার এবং মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাও হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকোলজিক্যাল সায়েন্সে বেশ কয়েক বছর আগে একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। লেখক ছিলেন মনোবিদ টিমোথি জে। নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘দ্য ইউটিলিটি অ্যান্ড ইউবিকুইটি অব ট্যাবু ওয়ার্ডস’। তাতে লেখক বলেছেন, গালি দেওয়াটা অনেকটা গাড়ির হর্ন বাজানোর মতো। রাগ, হতাশা, আনন্দ বা বিস্ময়Ñএমন আবেগের তীব্রতা বোঝানোর জন্য মানুষ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে থাকে। আবার অন্যের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যও অনেক সময় অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে মূলত অন্যের চরিত্রের ভিন্নরূপ বের করে আনার চেষ্টা থাকে।

এ গবেষণাপত্রে আরো বলা হয়, গালিগালাজ বা কটু শব্দ কিছু ক্ষেত্রে মানুষের জন্য ইতিবাচকও হয়। এতে মানুষ নিজের রাগ, ক্ষোভ, হতাশা ইত্যাদি নিখুঁত মাত্রায় প্রকাশ করতে পারে। সেই সঙ্গে শারীরিকভাবে আগ্রাসী হওয়ার প্রতিস্থাপকও হতে পারে গালিগালাজ।

বাংলা ভাষার গালিগালাজের আবার লিঙ্গপরিচয়ও অত্যন্ত প্রভাবশালী। ২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বেসরকারি সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ একটি জরিপ করেছিল। তাতে দেখা গেছে, বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক কথা, গালি ও তিরস্কারমূলক শব্দ সাধারণত নারীকে অবমাননা করার জন্য ব্যবহৃত হয়। সংস্থাটির করা ‘সেফ সিটিজেন ফর উইমেন’ নামের ওই জরিপে দেখা গেছে, ৮৮ শতাংশ নারী রাস্তায় অপমানজনক মন্তব্যের মুখে পড়েন এবং ৪৬ শতাংশ নারী অপমানজনক ভাষার শিকার হন। এবার কিছু বাংলা গালির শাব্দিক বিশ্লেষণ করে ফেলুন, বুঝে যাবেন। তা-ও অস্পষ্টতা থাকলে নিজের পরিবারের নারী সদস্যদের অভিজ্ঞতা জানতে চাইতে পারেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্য মন তিক্ত হবে বেশি।

অহেতুক গালি দেওয়ার এই প্রবণতা থেকে এ দেশের কিছু মানুষ কবে মুক্ত হবেন, কে জানে। অন্তত এখন পর্যন্ত এর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং তীব্রতা বাড়ছে।  

ইত্তেফাক/এসটিএম