শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কৃত্রিম জগতই নিয়ন্ত্রণ করিবে মানুষকে!

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

প্রশ্ন উঠিয়াছে যন্ত্রের এআই তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লইয়া। যন্ত্র যদি মানুষের মতো চিন্তাভাবনা করিতে পারে, মানুষের মতো সৃজনশীল ও ফরমায়েসি কাজ নিখুঁতভাবে করিয়া দিতে পারে, তাহা হইলে আগামী দিনের নূতন দুনিয়া কেমন হইবে? সম্প্রতি পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন ঘিরিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নূতন কৌতূহলের জন্ম দিয়াছে। নির্বাচনের পর পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ইমরান খানের বিজয়ের দাবির ভাষণ প্রচার করেন, তখন তাহা সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করে। কারণ ইমরান খান জেলবন্দি, তাহার পক্ষে এইভাবে ভাষণ দেওয়া সম্ভব নহে।

আসলে অসম্ভবকে সম্ভব করাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ। এ ব্যাপারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে টেক-জায়ান্ট বিল গেটস বলিয়াছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি আগামী পাঁচ বত্সরের মধ্যে পৃথিবীর সকল মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনিবে। সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক্সেলেটরে চাপ বাড়িতেছে এবং ইহার ত্বরণের বৃদ্ধি আমরা এখনই দেখিতে পাইতেছি। সমাজ, রাজনীতি, চিকিত্সাবিজ্ঞান, লেখাপড়া হইতে শুরু করিয়া প্রায় সকল ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে রাজত্ব করিতে রিহার্সেল দিতে শুরু করিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, জেলবন্দি ইমরান খানের লেখা বক্তৃতা, পুরোনো বক্তৃতার ফুটেজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করিয়া তৈরি করা হইয়াছিল নূতন একটি ভাষণ। গত বত্সরের ১৭ ডিসেম্বর প্রচার করা ভাষণটিও ছিল পিটিআইয়ের প্রথম ভার্চুয়াল জনসভা। মাসের পর মাস ইমরান খানের চেহারা না দেখিবার পর এই ভাষণে প্রথম তাহাকে কথা বলিতে দেখা যায়। ইহাতে সেই সময় আবেগতাড়িত হইয়া পড়েন পিটিআই সমর্থকেরা। এই সাফল্যের পর হইতে নির্বাচনি প্রচারণায় জোরেশোরে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করিয়া দেয় পিটিআই। ইমরান খানের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি চ্যাটবট (কোনো কিছু জানিতে চাহিলে তাহার উত্তর দেওয়ার রোবট) ব্যবহার করা হয়। ইমরানের এই প্রোফাইলে কেহ ভোটসংক্রান্ত তথ্য জানিতে চাহিলে চ্যাটবটটি উত্তরে জানাইয়া দেয় ভোটসংক্রান্ত যে কোনো জিজ্ঞাসা। ভোট দিতেও এই চ্যাটবট উদ্বুদ্ধ করিয়াছে। চ্যাটবটটি এতই প্রাণবন্ত যে, ভোটাররা যেন মনে করিয়াছেন—তাহারা ইমরান খানের সহিতই কথা বলিতেছেন!

সত্যিকার অর্থে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স লইয়া বিশ্বের নানা প্রান্তে এই বত্সর চলিয়াছে নানাবিধ তর্কবিতর্ক। কিছুদিন পূর্বে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রযুক্তিবিষয়ক কলামিস্ট জেওফ্রি এ ফ্লাওয়ার একটি নিবন্ধে জানাইয়াছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই ব্যবহার করা হইতেছে কণ্ঠ তৈরিতে, তহবিল সংগ্রহের ইমেইল এবং ‘ডিপফেক’ ইমেজ তৈরি করিতে, যাহা পূর্বে কখনো ছিল না। এইদিকে বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান শ্যাক্সের একটি প্রতিবেদন বলিতেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কাজের এক-চতুর্থাংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়া প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। তবে ইহা মুদ্রার একটি দিক। অন্য দিক হইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে নূতন নূতন চাকরির সুযোগ ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পাইবে নিশ্চিতভাবেই। আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব একেক সেক্টরে একেক রকমভাবে পড়িবে। ইতিপূর্বে কিছু চিত্রশিল্পী উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া জানাইয়াছিলেন, এআই ইমেজ জেনারেটর তাহাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার ক্ষতি করিতে পারে। তবে মনে রাখিতে হইবে, বিশ্বের ৬০ শতাংশ শ্রমিক এখন এমন পেশায় রহিয়াছে, যাহার কোনো অস্তিত্ব ১৯৪০ সালে ছিলই না। এইদিকে গত মে মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব লইয়া যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে শুনানি হয়। সেইখানে রিপাবলিকান সিনেটর মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের জোশ হাউলি বলিয়াছিলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে রূপান্তরিত হইবে, যাহা আমরা কল্পনাও করিতে পারি না। আমেরিকানদের নির্বাচন, চাকরি এবং নিরাপত্তার উপর তাহা প্রভাব ফেলিবে। কংগ্রেসের কী করা উচিত তাহা বুঝিবার জন্য এই শুনানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।’

সুতরাং আমাদের এখনই সিটে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া বসিতে হইবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়কর জাদু মোকাবিলা করিতে প্রস্তুত হইতে হইবে এই বিশ্বকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বুদ্ধিমত্তার সহিত ব্যবহার করিবার সক্ষমতা কিংবা অক্ষমতা অনেক কিছুই নির্ধারণ করিয়া দিবে। মনে হইতেছে কৃত্রিম জগত্ই নিয়ন্ত্রণ করিবে মানুষকে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন