বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশ্বব্যাপী যেন শিশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

আধুনিক সশস্ত্র সংঘাতে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ হতাহতের পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নে চরম অবহেলার চিত্রই বেশি করে চোখে পড়ে। ইউক্রেন কিংবা গাজা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সুদান বা মিয়ানমারের সহিংসতা—সব ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা বিরাজমান। এর সঙ্গে বাড়ছে আরেক বিপত্তি। যুদ্ধের আইনকে (লজ অব দ্য ওয়ার) বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলার কারণে যুদ্ধসংক্রান্ত আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রে ভেঙে পড়ছে বা বিলুপ্ত হতে চলেছে। এরকম প্রেক্ষাপটে অনেকে মনে করেন, যুদ্ধ বা সংঘাতকালে বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করা হয় অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই। এই অভিযোগ সত্য হোক না হোক, বিষয়টি যারপরনাই মর্মান্তিক ও ক্ষমার অযোগ্য।

আমরা দেখে আসছি, যুদ্ধে শিশুদের প্রতি অমানবিক হয়ে উঠছে পক্ষগুলো। তবে শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা থামাতে জাতিসংঘ সব সময়ই সোচ্চার। শিশুর প্রতি আগ্রাসনকে ‘গুরুতর লঙ্ঘন (গ্রেভ ভায়োলেশনস)’ বলে অভিহিত করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। শিশুর প্রতি সংঘাত সম্পর্কিত সবশেষ প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘শিশুরা যুদ্ধ সম্পর্কিত সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।’

জাতিসংঘ মহাসচিবের কথা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তব চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব সহিংসতা চলছে, তাতে করে সবচেয়ে বাজে অবস্থায় পড়েছে শিশুরা। হত্যা ও পঙ্গুত্ব, ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, অপহরণ, স্কুলে হামলা ও শিশুসেনা নিয়োগের মতো বহু ঘটনা ঘটছে যুদ্ধকবলিত শিশুদের সঙ্গে। এ ধরনের প্রবণতা যে কাউকে ব্যথিত করে স্বাভাবিকভাবেই।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কথাই যদি বলি, দেখা যায়—২০২২ সালে দেশটিতে শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ বেড়েছে ১৪০ শতাংশের বেশি। একইভাবে দক্ষিণ সুদানে শিশুদের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে চলমান আন্তঃসাম্প্রদায়িক সহিংসতা। জাতিসংঘের নথিভুক্ত এমন দেশের তালিকায় রয়েছে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইসরাইল-ফিলিস্তিন, সোমালিয়া, সিরিয়া, ইউক্রেন, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনের নাম।

জাতিসংঘ যখন ওপরের তালিকা তৈরি করেছিল, তখনো গাজা যুদ্ধ শুরু হয়নি। অর্থাত্, গাজা সহিংসতা যেভাবে শিশুদের প্রাণ কাড়ছে, তাতে করে এই তালিকায় এখন সবার ওপরে থাকার কথা ফিলিস্তিনের নাম। কারণ, চলমান গাজা যুদ্ধে যে হারে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তা নিঃসন্দেহে অতীতের যে কোনো যুদ্ধে শিশুর প্রতি সহিংসতার রেকর্ড ভেঙে দেবে। গাজায় শিশুদের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা জানে গোটা বিশ্ব।

ফিলিস্তিনের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে চলমান সংঘাতে এরই মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সি সাড়ে ১১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অনেকে। প্রায় ২৪ হাজার শিশুর মধ্যে এক জন কিংবা উভয়ে পিতৃমাতৃহীন হয়েছে। পরিবারবিচ্ছিন্ন বা সঙ্গীহীন হয়েছে ১৭ হাজার। এসব একেকটা সংখ্যা কতটা ভয়াবহ, তা না বুঝতে পারার কথা নয়।

ফিলিস্তিনি শিশুদের মতো বিপর্যয়ে আছে ইসরাইলের শিশুরাও। গত ৭ অক্টোবর হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মধ্যে অনেক ইহুদি শিশুও ছিল। তাছাড়া হামাসের হাত থেকে যেসব জিম্মি এখনো মুক্ত হতে পারেননি, তাদের শিশুরা কেমনভাবে দিন কাটাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। এসবের মধ্যেই পরিস্থিতি করুণ আকার ধারণ করছে রাফা সীমান্তে। এই এলাকায় নতুন বিপর্যয় নেমে আসার উপক্রম হয়েছে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানের মুখে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, যুদ্ধ সর্বদাই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। গাজার শিশুদের অবস্থা আরো বিভীষিকাময়। এই অবস্থায় গাজার ১০ লাখেরও বেশি শিশুর জরুরি ভিত্তিতে মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।

যুদ্ধকবিলত গাজার শিশুরা নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার আতঙ্ক ও উদ্বেগ, ক্ষুধা হ্রাস, ঘুমাতে না পারা ইত্যাদি। সব থেকে বড় কথা, যখনই বোমা হামলার শব্দ তাদের কানে যাচ্ছে, চরম মানসিক অস্থিরতা ও আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে তারা।

কোনো দেশ বা অঞ্চলে যখন যুদ্ধ কিংবা সংঘাত দেখা দেয়, তখন খাদ্যাভাবে অপুষ্টি ও রোগ পেয়ে বসে বিশেষত শিশুদের। রোগব্যাধিই মারাত্মক শত্রু হয়ে ওঠে ছোট বাচ্চাদের। ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতেও শিশুর প্রতি অমানবিকতা প্রদর্শন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। বিশেষ করে, এটা জেনেভা কনভেনশনকে উপহাস করার দৃষ্টান্ত।

ইউনিসেফের ভাষ্য, ‘সব যুদ্ধেই সবার আগে ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। সবচেয়ে বেশি কষ্ট ও আঘাত আসে তাদের ওপরেই। যদিও যুদ্ধেরও নিয়ম রয়েছে।’ ইউনিসেফের ভাষায়, ‘যুদ্ধের সময় কোনো শিশুকে প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত নয়... কোনো শিশুকে জিম্মি করা উচিত নয়... হাসপাতাল বা স্কুলগুলোকে অবশ্যই বোমা হামলা থেকে রক্ষা করা উচিত... শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে তার দায় বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকে।’

দুঃখজনকভাবে ইউনিসেফের এসব কথা কানে তোলে না যুদ্ধবাজ পক্ষগুলো। আদৌ তোয়াক্কা করে না এসংক্রন্ত আন্তর্জাতিক আইন বা জেনেভা কনভেনশনের আহ্বান। তা না হলে গাজার শিশুদের অবস্থা এতটা ভয়াবহ হয় কীভাবে?

আমরা লক্ষ করছি, গাজা যুদ্ধ বন্ধে নানা কথা শোনা গেলেও যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে ব্যর্থতাই বেশি দৃশ্যমান। এর মধ্যেও গাজায় বেড়েই চলেছে শিশুমৃত্যু। অনুমান করা হচ্ছে, গাজায় এখনো প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর একটি শিশু মারা যাচ্ছে। আরো উদ্বেগজনক খবর হলো, প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছেন অন্তত দুই জন মা। এটা যে কতটা ভয়াবহ দৃষ্টান্ত, বুঝতে পারছেন?

গত সপ্তাহে গাজার শিশুদের পক্ষে সরব হয়ে তেল আবিবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন গিডিয়ন লেভি নামক এক ইসরাইলি লেখক। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কড়া সমালোচনা করে লেভি বলেছেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে হিংসাত্মক তাণ্ডব। ইসরাইলের সমাজেও এর প্রভাব পড়বে। ইসরাইলকে শেষ পর্যন্ত এর জন্য মূল্য চোকাতে হবে।’

লেভি আরো বলেছেন, ‘ইসরাইল গাজায় ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে মুছে ফেলছে। সেনারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে শিশুদের। যারা শিশুদের এভাবে হত্যা করেছে, তাদের কি মানুষ ভুলে যাবে? সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ কতক্ষণ নীরব থাকবে?’

এ তো গেল গাজার শিশুদের কথা। ২০২২ সাল থেকে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চরম বিপদে আছে এই অঞ্চলের শিশুরাও। সবচেয়ে বড় কথা, ইউক্রেনের হাজার হাজার শিশুকে অবৈধভাবে অপহরণ করার অভিযোগ রয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। কিয়েভ বলে আসছে, ‘২ লাখের মতো শিশু অপহরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে হাজার বিশেক মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।’ কিয়েভের এমন অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন পশ্চিমা মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনা হলেও অপহূত শিশুদের উদ্ধারে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা শোনা যায়নি।

চলতি মাসে ‘শিশুদের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ’ নামক এক সম্মেলনে যোগ দেন লাটভিয়ার প্রেসিডেন্ট এডগারস রিংকেভিচস। রাজধানী রিগায় অনুষ্ঠিত ঐ সম্মেলনের এক বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনীয় শিশুদের পরিচয় মুছে ফেলছে এবং অবিশ্বাস্য মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি করছে। শিশু পাচারকে কার্যকরভাবে যুদ্ধের অস্ত্র বানিয়েছেন পুতিন, যার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত ইউক্রেনের ভবিষ্যত্ ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন।’

নানা সংকটের সম্মুখীন ইথিওপিয়ার শিশুরাও। ৩০ লাখেরও বেশি শিশু খাদ্যাভাবে ধুঁকছে। ১২৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে ৪৫ শতাংশ মানুষ ১৫ বছরের কম বয়সি। ত্রাণের অভাবে এখানকার মানুষের অবস্থা এতটা শোচনীয় পর্যায়ে উপনীত যে, এই সংকটকে ১৯৮৪ সালে জেঁকে বসা কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। খরা ও যুদ্ধ—এই দুইয়ের কবলে পড়ে ঐ সময় যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাতে মারা যায় ১০ লাখ ইথিওপিয়ান। জাতিসংঘ এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ‘২ কোটিরও বেশি ইথিওপিয়ানের খাদ্যসহায়তার বিশেষ প্রয়োজন।’ ইথিওপিয়ার শিশুদের এই অবস্থার জন্য যে ‘তাইগ্রে সংকট’ একমাত্র দায়ী, সে কথা বলাই বাহুল্য।

সশস্ত্র গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন অপরাধী চক্র নিজেদের স্বার্থ হাসিলে শিশুদের জোরপূর্বক ব্যবহার করছে। ‘জোরপূর্বক শিশুদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের প্রবণতা’ বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ক্রমশ। জাতিসংঘের এক হিসাবে বলা হয়েছে, ‘২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজারেরও বেশি শিশু (ছেলে ও মেয়ে) সহিংস সংঘর্ষে জড়িত ছিল। এই সংখ্যা বাড়বে বই কমবে না।’

মনে রাখা জরুরি, শিশুসেনাদের কেবল যুদ্ধ করার জন্য তৈরি করা হয় না; গার্ডের কাজকর্ম, নজরদারি চালানো ও কুরিয়ার আনানেওয়ার মতো কাজেও ব্যবহার করা হয় তাদের। সব থেকে উদ্বেগজনক কথা হলো, যৌনভাবে শোষণ করা হয় শিশুদের। সম্প্রতি ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়ার এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখিয়েছেন, শিশুদের ব্যবহার করে কীভাবে হত্যা, মাদক ব্যবসা ও ডাকাতির মতো অপরাধকর্ম চালানো হচ্ছে।

শিশুদের ব্যবহার করে মিয়ানমার, বুরকিনা ফাসো ও মালিতে স্কুল ও হাসপাতালে হামলা বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বোকো হারাম সন্ত্রাসীদের শয়ে শয়ে স্কুল ছাত্রীকে অপহরণ করার ঘটনাও আমাদের জানা। এর পরও শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। এটা লজ্জাজনক, মর্মান্তিক। যুদ্ধে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক। 

লেখক: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নিয়মিত কলামিস্ট

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন