সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্নীতি ও শিক্ষক সমাজ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩০

বর্তমানে বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু ভাইস চ্যান্সেলরকে (ভিসি) প্রায়ই জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হতে দেখা যায়। এজন্য নয় যে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে খুব ভালো অবদান রাখছেন বরং তাদের কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বদনাম হচ্ছে, শিক্ষার গুণমান তলানীতে যাচ্ছে। ভিসিদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এমন কোনো নেতিবাচক বিশেষণ বাকি নেই, যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। তার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত কাউকে কাউকে থামানো যাচ্ছে না। ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নির্দেশনাও মানছেন না তারা। তাহলে প্রশ্ন হলো, দুর্নীতিবাজ এসব ভিসিকে রুখবে কে?

বাংলাদেশে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন বা সংবিধি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ভিসির মহান দায়িত্ব হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বা সংবিধি সমুন্নত রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বা সংবিধিতে ভিসিদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্টায়ন করা থাকে। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এজন্য যে, এখানে যারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তারা হবেন শিক্ষক, যাদের জাতির বিবেক ধরা হয়। ধরে নেওয়া হয় যে একজন শিক্ষক কোনোমতেই বিবেকবর্জিত হবেন না। একজন শিক্ষক কখনোই অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবেন না। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে, অনেক ভিসিই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন বা সংবিধি সঠিকভাবে মানছেন না, বরং প্রদেয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের সুবিধামতো নতুন নতুন নিয়ম তৈরি করছেন এবং তার প্রয়োগ করছেন, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি ব্যাপক হারে বেড়েই চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বলে ভিসিদের হাতে প্রভূত ক্ষমতা থাকায় তারা যা ইচ্ছে তাই করছেন এবং তা বৈধ করে নিচ্ছেন সিন্ডিকেট/রিজেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে। অধিকাংশ সিন্ডিকেট/রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য ভিসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পছন্দ করেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট/রিজেন্ট বোর্ডে সরকারি আমলা, জনপ্রতিনিধি (সাংসদ), ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল প্রফেসর, শিক্ষাবিদ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে অনেককেই কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। অনেক সিন্ডিকেট/রিজেন্ট বোর্ড মেম্বার নিজস্ব স্বার্থের কারণে  (চাকরি, টেন্ডার) চুপ থাকেন। অবশ্য কেউ কেউ চেষ্টা করেন, তা না হলে অন্য সব ভিসি হয়তো আরো বেপরোয়া হতেন। বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে অনিয়ম হতে দেখা যায়, তার মধ্যে বেশির ভাগই ভিসির পারসোনাল ইন্টারেস্টের কারণেই হয়। ভিসিরা নীতি-নৈতিকতা ভুলে গিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ ভুলে যান।

বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি-বিরোধী আন্দোলন বা ভিসিদের অপসারণ/পদত্যাগ দাবি একটি প্রচলিত আন্দোলন। একসময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভ্যন্তরীণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা একসঙ্গে বা আলাদা করে আন্দোলনের মাধ্যমে ভিসি অপসারণ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি করত। আন্দোলনের মাত্রা বা ভয়াবহতা চিন্তা করে সরকার তখন ভিসি অপসারণ করত। বাংলাদেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি-বিরোধী এ ধরনের প্রচলিত আন্দোলন একটি ধারায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের আন্দোলন হলেও সরকার সহজে ভিসি অপসারণ করতে চায় না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থিতিশীল রাখার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে লক্ষণীয় যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌক্তিক আন্দোলন হলেও ভিসি পরিবর্তন হচ্ছে না, বরং সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবেই হোক ভিসিকে বহাল রেখেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিদের দুর্নীতির কারণে অনেক সময় তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হয় না, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ভিসি ধরেই নিয়েছেন যে তাদের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন বা তদন্তই হোক না কেন, তাদের কোনো কিছুই হবে না। কোনো কোনো ভিসি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম স্বেচ্ছাচারিতা করে যাচ্ছেন, বিভিন্ন ধরনের অন্যায়-অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। সরকার যে উদ্দেশ্যে ভিসিদের সমর্থন দেন, ভিসিরা তার সঠিক ব্যবহার করছেন না।

বর্তমানে অনেক ভিসিই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকমতো কাজ করছেন না বা তাদের সঠিকভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ভিসি বলয় ভিসিদের ভুল পথে পরিচালিত করছে। ভিসিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ বা সুযোগ-সুবিধা এবং একাডেমিক দিকগুলোতে  গুরুত্ব দিচ্ছেন কম। বরং নিয়োগ, টেন্ডার, নতুন উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদি কাজে বেশি আগ্রহ দেখান। এ ধরনের ভিসিরা নিজেদের অন্যায়-অনিয়ম ঢাকতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। কিছু কিছু ভিসি রাজনৈতিক নেতা কিংবা কর্মীর মতো রাজনৈতিক চর্চায় সময় দেন বেশি। ভিসি যে একজন শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয় যে একটি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেটা অনেক সময় ভুলে যান। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বকীয়তা হারাচ্ছে। এজন্য ভিসিদের কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসি নিয়োগের সময় হলে ভিসি প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়। নিয়োগ পেতে ভিসি প্রার্থীরা তাদের ভালো চেহারাটাই উপস্থাপন করেন। যদিও ভিসি নিয়োগের জন্য কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না, তার পরও ভিসি প্রার্থীদের তদবির-লবিং দেখলে মনে হয় এদের ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয় না, বরং এরা নিজেরাই ভিসি হয়ে আসেন। তবে যেভাবেই নিয়োগ পান না কেন, একজন ভিসি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাকে একটা লিখিত আন্ডারটেকিং দেওয়া দরকার, যেন তারা  বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বা নিয়ম-নীতির ওপর শ্রদ্ধাশীল থাকেন, কোনো প্রকার অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা না করেন। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে যেন দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়। যেসব ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায়-অনিয়ম করবেন, তাদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে বলেই মনে করি। তবে এটাও সত্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে অনেকে ভিসি-বিরোধী কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, তাই এগুলোরও সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে বর্তমানে যেসব ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা করছেন, সরকারের উচিত সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা, অপরাধ প্রমাণে দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় আনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার গুণমান নিশ্চিত করতে এর বিকল্প নেই। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয়। স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয় মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র সুশাসন নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সঠিক পরিবেশ বজায় রাখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণমান ধরে রাখতে না পারলে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ আরো কঠিন হবে।  

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন