বাংলার বিখ্যাত সংগীত শিল্পী মান্না দের গান শোনেন নাই, এমন সংবেদনশীল বাঙালির দেখা পাওয়া দুষ্কর। তিনি এক গানে গাহিয়াছেন পরম মমতায়—‘তুমি কি সেই আগের মতোই আছো/ নাকি অনেকখানি বদলে গেছ/ খুব জানতে ইচ্ছে করে, খুব জানতে ইচ্ছে করে।’ পৃথিবীর কাছেও আজ আমাদের জানিতে ইচ্ছা করে, এই পৃথিবী কি আর পূর্বের মতো আছে, নাকি অনেকখানি বদলাইয়া গিয়াছে? দেশে দেশে রাজনীতির স্বরূপ ও গতিধারা যেইভাবে দ্রুত বদলাইয়া যাইতেছে, তাহাতে বিস্ময়ের সীমা নাই। সত্যিই গত কয়েক দশকের পৃথিবীকে আজ চেনাই যায় না!
জ্ঞানবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষ্টিকালচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে পৃথিবীতে দ্রুত পরিবর্তনের হাওয়া লাগিয়াছে। সোশ্যাল মিডিয়ার পর এখন এআই তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নূতন পরিবর্তনের দোলা দিতেছে। দেশে দেশে রাজনীতিতেও কি তাহার পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগিতেছে না? দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে যেইভাবে এআই প্রযুক্তি নির্বাচনে প্রভাব ফেলিল, কারাবন্দি থাকিবার পরও নেতার ভাষণ শুনিয়া মানুষ উজ্জীবিত হইল, তাহাতে আমরা নূতন পৃথিবীর নূতন রূপ ও গন্ধের সন্ধান পাই। ইহার পূর্বে পরাশক্তিধর একটি দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা হ্যাকিংয়ের শিকার হইয়াছিল বলিয়া দাবি করা হয়। বিশ্ব পরিবর্তনটা এত দ্রুততর হইতেছে যে তাহার সহিত তাল মিলাইয়া চলা কঠিন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও আমরা একের পর এক বিস্ময়কর সকল ঘটনা প্রত্যক্ষ করিতেছি। ভূরাজনীতির সাজানো মাঠ আজ এফোঁড়-ওফোঁড় হইয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বে এখন যাহা ঘটিতেছে তাহা এক কথায় সম্পূর্ণ পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট।
অবশ্য এই পৃথিবীতে পরিবর্তনের ধাক্কা কেবল আমরাই প্রথম টের পাইতেছি, তাহা নহে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তনে কাঁপিয়া উঠিয়াছে বিশ্ব। বিশেষ করিয়া পঞ্চাশের দশকে সিয়াটো-সেন্টো লইয়া কম হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে নাই। তাহার প্রভাবে ছোট্ট ছোট্ট দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চুরমার হইয়াছিল। তখন বিশ্বে ছিল দুই পরাশক্তির খেলা। পুঁজিবাদি ও সমাজতন্ত্রী—এই দুই ব্লকে বিশ্ব বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। যাহারা ইহার বাহিরে গিয়া জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, তাহাদের অনেকের ভাগ্যে ঘটে করুণ ও শোচনীয় পরিণতি; কিন্তু এখন বিশ্বপরিবর্তনের প্রকৃতি ভিন্ন। মালটিপোলার বা বহুমেরুকরণের যুগে কে যে কোথা হইতে কলকাঠি নাড়িতেছেন, তাহা নির্ণয় করাই কঠিন। ইহার প্রভাবে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে একের পর এক অস্থিতিশীলতা তৈরি হইতেছে। খুব অধিক দূরে যাইবার দরকার নাই। সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে যাহা ঘটিয়াছে তাহাও এক অবাক-বিস্ময়। বিভিন্ন মহাদেশ-উপমহাদেশে আজ আঞ্চলিক শক্তির উত্থান লক্ষণীয়। এই উত্থানে পরাশক্তিদের চাওয়া-পাওয়ারও অনেক সময় হিসাব মিলিতেছে না। একটা পর্যায়ে আসিয়া তাহারা চলিয়া যাইতেছে ব্যাকফুটে। অগত্যা তাহারা ইহাও মানিয়া লইতেছে। বর্তমানে ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, সুদান, মিয়ানমারে যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ চলিতেছে। ইহার পাশাপাশি চলিতেছে নিষেধাজ্ঞার পর পালটা নিষেধাজ্ঞা। ইহাতে বিশ্ব অর্থনীতি সীমাহীন দুর্দশায় নিপতিত হইলেও ক্ষমতার এই লড়াই ও প্রতিযোগিতা থামিতেছে না। বরং দিনদিন বীভত্স রূপ ধারণ করিতেছে। এই সকল আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির কোপানলে পড়িয়া তৃতীয় বিশ্বের ছোট ছোট দেশগুলির এখন ত্রাহি ত্রাহি ও ত্রিশঙ্কুল অবস্থা। তাহাদের পক্ষে ভারসাম্য রক্ষা করাও এখন কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। বিশেষত, এই সকল দেশে ভোটের প্রকৃত ক্ষমতা আর ভোটারের নিকট নাই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সামরিক-বেসমারিক প্রশাসন অথবা মাশলম্যানদের করায়ত্তাধীন হইয়া পড়িয়াছে। নির্বাচনটা হইয়া পড়িয়াছে মূল্যহীন ও গতানুগতিক।
নূতন এই বিশ্বে টিকিয়া থাকাটাই আজ বড় কথা। আমরা যতই চেষ্টা করি, পূর্বের জায়গায় যাইতে পারিব না। হারানো মিত্রের জন্য আফসোস করিয়া লাভ নাই। নূতন মিত্রের অনুসন্ধান বা পুরাতন মিত্রকে নূতনরূপে বরণ করিয়া হইলেও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে প্রতিনিয়ত কৌশল অবলম্বন করিয়া প্রাণ বাঁচাইয়া চলিতে হইবে। বিশেষ করিয়া পররাষ্ট্রনীতিতে সামান্য ভুল করিলে তাহার মাশুল গুনিতে হইবে কড়ায় গন্ডায়।
