এক জন দুই জন নহে, মঙ্গলগ্রহে আগামী আড়াই দশকের মধ্যে ১০ লক্ষ মানুষকে পাঠাইবার পরিকল্পনা করিয়াছেন বিশ্বের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি ইলন মাস্ক। মৃত্যুর পূর্বে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলিয়া গিয়াছিলেন—মানবসভ্যতাকে টিকাইয়া রাখিতে হইলে মানুষকে অবশ্যই অন্য গ্রহে বসতি স্থাপন করিতে হইবে। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, পৃথিবী নানান কারণে নিঃস্ব-রিক্ত হইয়া পড়িতেছে। পরিবেশ বিষাইয়া যাইতেছে। মানুষের ভার বহনের ক্ষমতা হ্রাস পাইতেছে পৃথিবীর। ইহার জন্য মানুষেরই অবিমৃশ্যকারী কাণ্ডকারখানাই দায়ী। সুতরাং নিকটবর্তী উপগ্রহ চাঁদ কিংবা নিকটবর্তী লাল গ্রহ মঙ্গলের দিকে মানুষের দৃষ্টি বহু দিন ধরিয়াই নিবদ্ধ। মানুষ চাঁদে গিয়াছে বেশ কয়েক বার। সেইখানে পানি নাই, অক্সিজেন নাই, ভয়ংকর প্রতিকূল পরিবেশ। কেবল পায়ের তলায় জমিন আছে মাত্র। তাও সেই জমিন ঘনঘন ভূমিকম্পে কাঁপিয়া উঠে। মঙ্গলের সহিত পৃথিবীর আয়তন আকৃতির কিছুটা মিল থাকিলেও তাহার স্বাভাবিক পরিবেশ একদমই মানুষের বসবাসের উপযুক্ত নহে। সেইখানেও অক্সিজেন বা তরল পানি নাই। তবে ইলন মাস্ক যখন মঙ্গলকে মনুষ্য বসতির জন্য উপযুক্ত করিয়া গড়িয়া তুলিবার মহাপরিকল্পনা তথা মহা ইচ্ছার কথা জানাইয়াছেন, তখন তাহা সমগ্র বিশ্বেই আলোচনার বিষয় হয়। মাস্কের মতে, লাল গ্রহটিতে স্বনির্ভর বসতি স্থাপনে খরচ হইবে ১০০ বিলিয়ন হইতে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রতি বত্সর কয়েক মেগা টন কার্গো মঙ্গল গ্রহে লইবে মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের রকেট। স্টারশিপের লক্ষ্য প্রতিদিন গড়ে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করা, ইহাতে প্রতি বত্সর ১ হাজারের অধিক ফ্লাইট পাঠান হইবে, প্রতি ফ্লাইটে যাবে ১০০ টনের বেশি কার্গো।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে হোসেন মিয়া বসতিশূন্য ময়নাদ্বীপে ভুখা-নাঙ্গা সাধারণ মানুষকে লইয়া নূতন বসতির উদ্যোগ লইয়াছিলেন। সেইখানে দেখানো হইয়াছিল নূতন বসতি স্থাপনের বিচিত্র সকল টানাপড়েন ও নেপথ্য উদ্দেশ্য। মনে হইতে পারে—ইলন মাস্ক যেন আধুনিক সময়ের হোসেন মিয়া। তবে নূতন নূতন জায়গায় বসতি তথা উপনিবেশ গড়িয়া তোলা মানুষের আদিম অভ্যাস। ইহার লক্ষ্যেই অসংখ্য অভিযান হইয়াছে। হইয়াছে শতসহস্র যুদ্ধ। মানুষ যখন সভ্য হইয়া উঠে নাই, তখনো আধিপত্য বিস্তারের জন্য কাদা-ছোড়াছুড়ি করিয়াছে। মানবজাতির ইতিহাস মূলত যুদ্ধের ইতিহাস। এখন কথা হইল, মঙ্গলে মানবজাতি যদি সত্যিই উপনিবেশ গড়িয়া তুলিতে পারে, তাহা কি পৃথিবীর যুদ্ধ-ভাইরাস মুক্ত হইবে? নাকি সেইখানেও একটি পর্যায়ে আসিয়া শুরু হইবে যুদ্ধের পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ? সেইখানেও কি কোনো এক কবি বীতশ্রদ্ধ হইয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ভবিষ্যতে প্রশ্ন তুলিবেন—‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।’ কাজী নজরুল ইসলাম যেমন ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় লিখিয়াছেন—‘গাহি সাম্যের গান—যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।’ মঙ্গলে কি মোটা দাগে বাধা-ব্যবধান মুছিয়া ফেলা যাইবে? নাকি সেইখানেও বিপুল ফসলের আবাদের পরও রাতে না খাইয়া কোনো শিশুকে ঘুমাইতে যাইতে হইবে? সেইখানেও যুদ্ধে মরিবে কি শতশত শিশু? নূতন নূতন রাষ্ট্র নূতন সীমারেখা টানিবে কি? সীমান্তে চলিবে কি হত্যা? যুদ্ধ আর অর্থনীতির ক্ষেত্রে সেইখানেও কি ঈশানকোণে জমিবে বৈষম্যের মেঘ? নাকি সত্যিই মঙ্গলে থাকিবে ইক্যুয়াল অপরচুনিটি? অর্থাত্ সকলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। অনেক প্রশ্ন। উত্তরগুলি অজানা। কারণ মানুষ অত্যন্ত রহস্যময় প্রাণী। মানুষের মনোজগত্ অত্যন্ত জটিল। মহাবিশ্বের মতো মানুষের মনেরও তল খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। তাহার পরও আমরা ইতিবাচকভাবেই চিন্তা করিব। মনে করিব, মঙ্গলে মানুষের মঙ্গলই হইবে।
