চারদিকে মশা: অতিষ্ঠ মানবকুল

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩৯

মশা নিধনের কার্যকর সমধান কখনোই হয় না, এবারও হবে না। মশার দখলেই থাকবে ঢাকা। গত বছরের শেষের দিকে দুবাইতে ছিলাম ১১ দিন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে লন্ডনে চিকিত্সক ছেলেমেয়ের কাছে ছিলাম মাসখানেক। একটি মশাও দেখিনি দুবাই আর যুক্তরাজ্য জুড়ে। ফিরছি দেশে। উড়োজাহাজ শাহজালার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লেন্ডিংয়ের পর দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ‘বাংলাদেশ মশাবাহিনী’ যেন হুড়মুড় করে বিমানে ঢুকে পড়ল। তারপর শুরু হলো বাংলা মশার জুলুম। যেদিন যাচ্ছিলাম, সেদিন বিমানে যে পরিমাণ মশার কামড় খেয়েছি, বিমান উড্ডয়নের পর দেশের সীমানা পেরোলেও বাংলা মশার জুলুম-অত্যাচার কমেনি। বোধ করি বাংলাদেশ মশাবাহিনীর সদস্যরা দুবাই, লন্ডনেও আমাদের সঙ্গে করে গিয়েছিল। যে পরিমাণ কামড় দিয়েছে আমার দেশি মশা, ১০-১২ দিনেও দাগ আর ফোলা কমেনি। শরীরে দাগ হয়ে আছে এখনো। দেশে ফিরে আসার পর মশাদের যে জুলুম হচ্ছে, তার বর্ণনায় আর নাই গেলাম। যখন লিখছি, তখনো মশায় তার কর্ম করে যাচ্ছে। মশা নিধনে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর আন্তরিকতার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হয়তো আজীবন মশার জুলুম সইতে হবে আমাদের।

সত্যিই কি রাজধানীতে মশারা বশে আসছে না? শীত শেষে রাজধানী ঢাকায় দাবড়ে বেড়াচ্ছে মশার দল। এই মশা দুই সিটি কনপোরেশনের সুনামে হুল ফোটাচ্ছে! ফোটাবেও। এ বছর রাজধানীতে অন্যান্য বছরের তুলনায় মশার উত্পাত একটু বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এলাকার বাসিন্দারা এর জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর, দক্ষিণ) অবহেলাকে দায়ী করেন। অবহেলা যে আছে, সেটা নাগরিকেরা ঠিকই বোঝেন। মশা নিধনে বরাদ্দের অর্থের সঠিক ব্যবহার হয় না। মশা নিধনে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। মশাদের বশ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আন্তরিক হতে হবে। অনিয়মের জায়গাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। তা কতটা সম্ভব সে নিয়েও প্রশ্ন আছে।

মেয়রদ্বয়ের প্রতি মিনতি, আপনারা মশা ঠেকান! এখানে ব্যর্থ হলে সময়মতো জনগণ তার জবাব দেবেই। বিগত ইতিহাস থেকে তাই শিখেছি আমরা। আজকাল মশা যেভাবে কামড়াচ্ছে, তাতে করে নির্বাচনের সময় কামড়ের জ্বালা বোধ করি সিটি মেয়রগণ টের পাবেন। মশা অতি ক্ষুদ্র এক কীট হলেও ক্ষমতার গদি নড়বড়ে করতে এর জুড়ি নেই।

প্রশ্ন হলো, মশা নির্মূলে কী করছে দুই সিটি করপোরেশন? ডিসিসি উত্তর ও দক্ষিণে মশা নিধনের জন্য ১ হাজারের ওপর মশকশ্রমিক কর্মরত আছে। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পাঁচ-ছয়জন কর্মী আছে বলে পত্রিকায় জেনেছি, যাদের কাজ শুধু মশার ওষুধ ছিটানো। প্রতি বছর মশা নির্মূলে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পায় দুই সিটি করপোরেশন। এত কিছুর পরও রাজধানীতে দিনে দিনে মশার প্রকোপ বাড়ছে কেন?

সমস্যা আছে অনেক। জেনেছি, লোকবল আছে, ওষুধ আসে, তবে সেই ওষুধ ঠিকঠাকমতো ছিটায় কি না, তার শক্ত মনিটরিং নেই। পত্রিকায় মশা বাড়ার খবর ছাপা হলে কিছুটা দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়।

লক্ষ করা গেছে, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিজাত এলাকা ছাড়া কোথাও ক্রাশ প্রোগ্রামের বাস্তবায়ন কম, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ প্রায় দেড় কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত মহানগরীতে নাগরিকদের সব সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্তি একই মানদণ্ডে বিচার্য হলেও অন্তত সার্বিক বিচারে কিছু কিছু বিষয়ে সব নাগরিকের প্রাপ্তিতে সমতা থাকা উচিত। মশায় একটা শ্রেণি ভুগলে অন্য শ্রেণি সুখে বাস করতে পারবে না।

ঢাকা সিটি করপোরেশন মশা নিধনের ব্যাপারে বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে নগরবাসীকে মশা থেকে রক্ষার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা ছাড়া মশক নিধন কর্মীদের নগরীর অন্য কোথাও দায়িত্ব পালন করতে খুব একটা দেখা যায় না। যদিও ডিসিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, লিকুইড ইনসেক্টিসাইড নামক কীটনাশক দিয়ে নগরীতে উড়ন্ত মশা নিধনের বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। কিন্তু মানুষ এখনো তার বাস্তবায়ন পরখ করতে পারছে না। বরং দিনে দিনে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আবদ্ধ ডোবানালা ও ড্রেনগুলোয় মশার বিস্তার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসিসিকে আরো জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মশা নিধনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও চিন্তা-ভাবনার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জবাবদিহি ও মনিটরিংয়ের অভাবও। কোথাও কোথাও ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা ফগার মেশিন চালিয়ে মশা দমন আদৌ সম্ভব নয়। মশা দমন ও নিধন করতে হলে মশার প্রজননক্ষেত্রের দিকে সর্বাগ্রে দৃষ্টি দিতে হবে। গোটা শহর কার্যত ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হয়ে আছে। রয়েছে মাইলের পর মাইল খোলা নর্দমা। দুই সিটি কপোরেশন এলাকায় প্রায় তিন হাজার বিঘা ময়লা ফেলার জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় ফেলা ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। ময়লা ফেলার স্থানগুলো মশা প্রজননের একেকটা ‘উত্কৃষ্ট’ ক্ষেত্র। খোলা নর্দমাগুলোও যথাসময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। মশার বংশবিস্তারে নর্দমাগুলোর বড় রকমের ভূমিকা রয়েছে। শুধু তাই নয়, দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি জলাশয়ই ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পূর্ণ। এগুলোও মশার উত্স হিসেবে কাজ করছে। মশার প্রজননস্থলসমূহ অবারিত ও উন্মুক্ত রেখে মশা দমন ও নিধনে সফল হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হতে পারে না।

প্রজনন ও উত্সস্থলেই মশার বংশ ধ্বংস করতে হবে। আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। আবর্জনা ফেলার জায়গাগুলো সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ঐ সব জায়গায় মশার জন্ম হতে না পারে। খোলা নর্দমাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে, ওষুধ দিতে হবে, যাতে সেখানে মশা জন্মাতে না পারে। একইভাবে জলাশয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, নিয়মিত ওষুধ ছিটিয়ে মশার লার্ভামুক্ত করতে হবে। উেস মশা দমন ও নিধন না করে উড়ন্ত মশা দমন ও নিধন কার্যক্রম চালিয়ে ঢাকাকে মশামুক্ত করা যাবে না। সিটি করপোরেশনদ্বয়কে এই সত্য উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ওয়ার্ড কমিশনারদের আরো দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হতে হবে।

মশা ক্ষুদ্র কীট। কিন্তু তার বিধ্বংসী ক্ষমতা ক্ষুদ্র নয়। বলা হয়, রাজা নমরুদকে জব্দ করতে আল্লাহ পৃথিবীতে মশা পাঠিয়েছিলেন। মশার কামড়ে ধ্বংস হয়ে যায় নমরুদ বাহিনী। আত্মগর্বী রাজার জন্যও মৃত্যু ডেকে আনে এই ক্ষুদ্র কীট। বিপদ না চাইলে মেয়রসহ সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের কুম্ভকর্ণের ঘুম থেকে জাগতে হবে। নিজেদের সুনামের স্বার্থেই মশা নামের ভয়ংকর শত্রুকে ঠেকাতে হবে। মশা মারা নিয়ে মশকরা অনেক হয়েছে। মানুষ এখন মশার কাছে জিম্মি। দোহাই মেয়র আপনাদের, মশা ঠেকান! এই মশা আপনাদের সুনামেই হুল ফোটাবে।

লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক

ইত্তেফাক/এমএএম