শখের বসের ছবি তোলা কখনো নেশা-পেশায় বদলে যায়। তখন একটি ক্লিকের আশায় ছবির কবিরা ছুটে চলেন নদী-বন্দর, পাহাড়-পর্বত, দেশ-বিদেশের সীমা পেরিয়ে। আর যাদের বাতিক হলো সাপ, পশু, পাখি, বনলতাকে ক্যামেরায় ধরে ফেলা তারা ঢুকে পড়েন গহীন জঙ্গলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন হিংস্র বুনো জন্তু, দুর্লভ পশু-পাখিদের সন্ধানে। পশুর স্বভাবের সাথে অভিযোজিত হয়ে নিজেরা গড়ে তোলেন সখ্যতা, আর খুব নিকটে গিয়ে প্রতি ক্লিকেই ধরে ফেলেন পশুর হিংস্র চাহনি, অঙ্গভঙ্গি আর দৃষ্টি ফেরাবার দুর্দান্ত সব মুহূর্ত। তাদেরকে বলা হয় ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার। তেমনি একজন নুরুন্নাহার নাফিসা।
খুলনার মেয়ে নাফিসা বড় হয়েছেন রাজধানী ঢাকা শহরে। বদ্ধ নগরীতে বেড়ে উঠা নাফিসার মাথায় সব সময় ঘুরপাক খেত সবার থেকে একটু ভিন্ন কিছু করতে হবে, ব্যতিক্রম কিছু একটা দাঁড় করাতে হবে। তাই একটু বড় হতেই দৃষ্টি আর আবদ্ধ থাকেনি চার দেওয়ালের মাঝখানে। ক্যামেরা হাতে, ভারী কস্টিউম পরে বেড়িয়ে পড়েছেন ছবির সন্ধানে। নাফিসা যখন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির জগতে এসেছেন তখন বলতে গেলে দেশে এই ধরণের ফটোগ্রাফির প্রচলনই শুরু হয়নি। তাই সেসময়ে একজন নারী হয়ে এই পথে পা বাড়ানো ছিলো বড্ড চ্যালেঞ্জিং।
প্রথম ধাক্কাটা এসেছিল পরিবার থেকে। এত বড় বড় লেন্স, ট্রাইপড, ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটবেন কীভাবে? আরো বড় কথা হলো একজন নারী হয়ে কীভাবে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবেন? চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায় পরিবারের সবার কপালে। তবে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই ধাক্কাটা সামলিয়ে নেন নাফিসা। বড় আপাদের সঙ্গে ছবি তুলতে যেতেন। প্রথমদিকে যেতেন কেবল ঢাকার আশেপাশে আর বোটানিক্যাল গার্ডেনে। তবে এতে মন ভরেনি নাফিসার। তার চায় আরো আরো জীবন্ত ছবি, পশুপাখিদের আরো চাঞ্চল্যকর মুহূর্ত। কিন্তু সেজন্য তো যেতে হবে তাদের আপন নীড় জঙ্গলে। সেখানে একা যাওয়া সম্ভব নয়। গ্রুপ করে কয়েকজন একসঙ্গে যেতে হয়। এখানেও পড়তে হলো জটিলতায়। তখন দু-একজন পুরুষ ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফীতে আসলেও নারীদের দেখা মিলা ছিলো দুঃসাধ্য। নাফিসা কিছু অনলাইন কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে জুটিয়ে নেন কয়েকজন সঙ্গী। তাদের সঙ্গেই ছুটে বেড়িয়েছেন জঙ্গলের দুর্গম পথে প্রান্তরে।
গত একযুগে নাফিসা তুলেছেন অজস্র পশুপাখির ছবি। তালিকায় রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, এশিয়ান হাতি, বানর, রাঙা মানিকজোড়, গুইসাপ, হুতুম পেঁচা, কানি বক, কালিম পাখি, তিলা নাগ ঈগলসহ নানা প্রজাতির পাখি ও সাপ। ঘুরেছেন দেশের বাইরেও। নাফিসার প্রত্যেক ছবিরই কিছু বিশেষত্ব থাকে। ইত্তেফাক প্রজন্মকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই ব্যতিক্রম কিছু করতে পছন্দ করি। ছবির ক্ষেত্রেও তাই। তথাকথিত ছবি না তুলে একটু চ্যালেঞ্জ নিয়ে পশুর শিকার ধরার বা দুর্লভ মুহূর্তকে ধরে ফেলার চেষ্টা করি’। নাফিসা আরো বলেন, ‘বনের পশুদের ছবি তুলতে গেলে তাদের সাথে একেবারেই মিশে যেতে হয়। তখন একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ছবি তুলতে গিয়ে যখন দেখি আমাদের সামনেই তিলে তিলে গড়ে উঠা একটি পাখির বাসাটা হটাৎ কোনদিন ভেঙে গেছে তখন খুবই খারাপ লাগতো। ওদের কষ্ট চোখেমুখে ফুটে উঠতে দেখতাম’।
নাফিসা নারীদের জন্য ২০১৮ সালে ওম্যান ফটোগ্রাফি সোসাইটি তৈরি করেছেন। যেখান থেকে অনেক নারী ফটোগ্রাফার তৈরি হচ্ছে। তাদের অনেকে ওয়াইল্ডলাইফেও আসছেন। নাফিসা চেষ্টায় আছেন এ পেশা থেকে নারীদের উপার্জনের পথ তৈরি করার। ভবিষ্যতে নিজের বায়োগ্রাফি নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছা পোষণ করেছেন এই আলোকচিত্রী।
