‘তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?’ সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘আমার পরিচয়’ কবিতার এই পঙ্ক্তিটি আমাদের এমন একটা সময়ের কথা মনে করাইয়া দেয়, যখন বিস্তৃত অববাহিকা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সামাজিকতা ও সংস্কৃতিকে নদীময় করিয়া রাখিয়াছিল। আবহমান কাল ধরিয়াই আমাদের উপমহাদেশের জনসাধারণের জীবন নদীর সহিত জড়িত। তাই তো নদী ও নদীপারের মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করিয়া রচিত হইয়াছে কালজয়ী সকল গান, কবিতা ও উপন্যাস; কিন্তু দখল, দূষণ, কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবসহ নানা কারণে নদীমাতৃক দেশের আজ করুণ অবস্থা। এই সমস্ত কারণে নদী শুকাইয়া খাল হইতেছে, খাল শুকাইয়া হইতেছে আবাদি জমি কিংবা অবৈধ নির্মাণের স্থান। নদীর দেশ বাংলাদেশের আজ নদীমাতৃক পরিচয়টাই যেন হারাইয়া যাইতেছে। আমাদের এই তের শত নদী কোথায় হারাইয়া গিয়াছে, আমরা কি তাহার সন্ধান করিতেছি?
বাংলাদেশের মানচিত্র হইতে অনেক নদী লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। সহস্রাধিক মূল ও শাখাপ্রবাহের মধ্যে টিকিয়া রহিয়াছে মাত্র ২৩০টি নদী। স্বাধীনতার পরও ছোটবড় মিলাইয়া দেশে স্রোতসম্পন্ন নদনদীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২৭৪টি। এরপর নিখোঁজ হইয়া গিয়াছে অসংখ্য নদনদী। বাকিগুলিও পানির অভাবে, দখলে, দূষণে মরিতে বসিয়াছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ইতিমধ্যে অনেক নদী শুকাইয়া খাল হইয়া গিয়াছে। দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলিতে পানি থাকিলেও ভাসিয়া আসা পলির কারণে সেইগুলি নাব্য হারাইতেছে। যাহার ফলে নদীর স্রোতের তীব্রতাও কমিয়া আসিতেছে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিদ্যমান নদী রক্ষার্থে অগভীর নদীগুলোতে ড্রেজিং করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। পাশাপাশি সংকীর্ণ নদীগুলির নিকট খাল কাটিয়া তাহার উেসর সহিত সংযোগ স্থাপন করিবারও প্রয়োজন রহিয়াছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহিত স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয় সাধন করিয়া এই সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি; কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এমন কার্যক্রমকে আমরা উন্নয়ন বলিয়া গণ্য করি না। নদীর উপর ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করাকেই উন্নয়ন হিসাবে অভিহিত করিতেছি। ইহার কারণে রাস্তাঘাট নির্মাণ করাটা রাজনৈতিক নেতাদের নিকট নদী খননের চাইতে অধিক আকর্ষণীয় বলিয়া বিবেচিত হইতেছে। কারণ রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করিলে জনগণের বাহবা পাওয়া যায়; কিন্তু নদী ও খাল খনন করিলে তাহা জনগণের নজরে উন্নয়নের মধ্যে পড়ে না।
বাংলাদেশের কৃষি ও মত্স্যসম্পদ নদনদী, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল ও জলাশয়ের উপর নির্ভরশীল। যদি নদী না বাঁচে তাহা হইলে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মধ্যে পড়িবে। নদনদী মানুষ ছাড়াও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। নদী তাহার আপন সৌন্দর্য হারানোর পাশাপাশি এই সকল প্রাণ ও উদ্ভিদের আবাসস্থল বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে। একের পর এক নদী শুকাইয়া যাওয়ার ফলে ইহার সহিত জড়িত প্রত্যেকের জীবনধারণে আসিতেছে ব্যাপক পরিবর্তন। যথেষ্ট পরিকল্পনার অভাবে যেই সমস্ত নদী কোনোরকম টিকিয়া রহিয়াছে, পলি পড়িবার কারণে সেই সমস্ত নদীর তলদেশ ভরাট হইয়া যাইতেছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই দুই কূল ভাসাইয়া সময়ে-অসময়ে হইতেছে বন্যা। এই সমস্ত কারণে হাজার হাজার পরিবারকে নিঃস্ব হইয়া রাস্তায় দাঁড়াইতে হইতেছে। ইহার সহিত বাড়িতেছে উদ্বাস্তু ও ভবঘুরে বেকার মানুষের সংখ্যা, যাহার বড় একটি অংশ রাজধানী শহরে ভিড় করিয়া থাকে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়া নদনদী, খাল-বিল, জলাশয়সহ সমস্ত জলাধারে পানি ধারণ না করাইতে পারিলে আমাদের দেশ অপূরণীয় ক্ষতির দিকে ধাবিত হইবে। দেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবিকা সংকটে পড়িবে। তাহা ছাড়াও জলবায়ু-উদ্বাস্তু হইবে উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ। দেশ হইতে হারাইয়া যাইবে জীববৈচিত্র্য, বিপন্ন হইবে প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই দেশকে বাঁচাইতে, দেশের মানুষকে বাঁচাইতে খাল কাটা কর্মসূচির পাশাপাশি নদনদীতে ড্রেজিং ও সংকীর্ণ নদী প্রশস্তকরণের অভিযান চালু করিতে হইবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সচেতন মহলকে বুঝিতে হইবে, ইহাও অনেক বড় উন্নয়নমূলক কাজ, যাহার ফলাফল হইবে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।
