সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নিকলীর হাওরে জিরাতিদের কষ্টের জীবন

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৫৫

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর জুড়ে বোরো ধানের সমারোহ। যত দূর চোখ যায়, যেন সোনালি ধানের সাম্রাজ্য! এই সাম্রাজ্য গড়তে গহিন হাওরে বছরের অর্ধেক জুড়ে পড়ে থাকে একদল মানুষ। স্থানীয়ভাবে এরা জিরাতি নামে পরিচিত, মূলত কৃষি শ্রমিক। বোরো মৌসুমে হাওরে ছোট ছোট কুঁড়েঘর বানিয়ে এতে থাকেন জিরাতিরা। আশপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে গাছপালা কিংবা ছায়া নেই। কিশোরগঞ্জের নিকলী, মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম —এ চারটি হাওর উপজেলায় কার্তিক থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে গলাঘরে বসবাস করেন বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০ হাজার জিরাতি।

লোকালয় থেকে বহু দূরে অবস্থিত কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে অস্থায়ী গলাঘর তৈরি করে বসবাস করছেন হাজার হাজার কৃষক। ‘জিরাতি’ নামে পরিচিত এসব কৃষক গবাদি পশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে ঝড়ঝঞ্ঝা আর বজ পাতে ঝুঁকির মধ্যেই কষ্টে বোনা ফসল ঘরে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করেন।

হাওরে ধানখেতের মাঝখানে চোখে পড়বে ছোট ছোট এসব কুঁড়েঘর। সামান্য উঁচু জমিতে তৈরি এসব অস্থায়ী ঘরে বাস করেন কয়েক শ কৃষক। জীবনের ঝুঁকির নিয়ে বছরের ছয় মাস জীবনকে তুচ্ছ করে মাঠে পড়ে থাকেন হাজার হাজার কৃষক। গবাদি পশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে গলাঘরে রাত কাটান তারা। এসব মানুষের নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার টয়লেট কিংবা রাতে ঘুমানোর মতো জায়গা।

বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, ছোট্ট কুঁড়েঘরে বসবাস করা জিরাতিরা ঘরের মাচায় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ঘুমান। মাচার নিচেই রাখা হয় গবাদি পশু। চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বসবাস করা এসব মানুষের ভাগ্যে জোটে না পুষ্টিকর খাবার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মোটা ভাত আর মরিচ ভর্তা কিংবা পান্তা ভাত দিয়ে চলে খাবার। নেই বিশুদ্ধ পানীয়জলের ব্যবস্থা।

প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয় খেতের আলে। আছে শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। তবে এ সবকিছু তুচ্ছ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কৃষকরা বছরের ছয়টি মাস পড়ে থাকেন হাওরে। নিজেদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজন ফেলে কার্তিক মাসে তারা পাড়ি জমান হাওরে। জমি তৈরি করা, চারা রোপণ, সেচ, পরিচর্যা থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই শেষে নতুন ধান সঙ্গে নিয়ে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বাড়ি ফেরেন জিরাতিরা। ফলন ভালো হলে তাদের মুখে হাসি ফোটে। ভুলে যান পেছনের দুঃখ-কষ্ট। আবারও প্রস্তুতি নেন পরের বার হাওরে যাওয়ার।

বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এভাবেই চলছে জিরাতিদের জীবনচক্র! বাপ-দাদা থেকে শুরু করে তাদেরও আগের বংশধররা এভাবেই চালাচ্ছেন নিজেদের কৃষিকাজ। কিন্তু নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই খাদ্য সৈনিকদের খবর নেয় না কেউ। তাদের জিরাতিকালে জীবনমান উন্নয়ন কিংবা সামান্য পানীয়জল আর স্যানিটেশন নিশ্চিত করা হলে দেশের জন্য তারা আরো বেশি অবদান রাখতে পারবেন।

নিকলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত ইত্তেফাককে বলেছেন, ছয় মাস হাওরে খাদ্য, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তারা কৃষিতে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম