সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:০০

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের ভাষা-সংস্কৃতি ধ্বংসের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উর্দুকে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেছিল। এর প্রতিবাদে ভাষা আন্দোলন হয় এবং বাংলা পরিণত হয় এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষায়। ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলন। অথচ ভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পরও সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে যারা পড়ে, তাদের প্রায় কেউই ভালোভাবে বাংলা লিখতে বা পড়তে পারে না। জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীর কোনো ভাষা শেখাই দোষের না। ইংরেজিভাষী দেশগুলোতে শিক্ষা, বসবাস বা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ইংরেজি ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও কোনো দ্বিমত  নেই। কিন্তু তার মানে এই না যে দেশের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজকর্ম ইংরেজিতে করতে হবে।

চীন, জাপান, রাশিয়াসহ অ-ইংরেজিভাষী সব দেশ শিক্ষাসহ সবক্ষেত্রে নিজেদের ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমেই দেশকে উন্নত করেছে। মহাকাশ প্রযুক্তির মতো জটিল বিষয়ও এসব দেশে নিজেদের ভাষায় পড়ানো হয় এবং দেশগুলোতে পড়তে গেলে বিদেশি শিক্ষার্থীদেরও শিখতে হয় তাদের ভাষা। বাংলাদেশে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে ইংরেজি না শিখলে জীবনই বৃথা! শুধু তাই না, এরা পরিকল্পিতভাবে বাংলা প্রতিশব্দ থাকার পরও কথা বলার সময় ভাষায় নতুন নতুন ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে যা ভাষার সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

দীর্ঘ বিদেশি শাসনের ফলে বাংলাভাষায় বিদেশি ভাষার অনেক শব্দ ঢুকেছে। আর্য আক্রমণের পর সংস্কৃত তত্সম ও তদ্ভব শব্দের তাণ্ডবে খাঁটি বাংলা শব্দগুলোই পরিণত হয়েছে সংখ্যালঘুতে। এরপর বাংলাভাষায় ঢুকেছে অনেক তুর্কি, ফারসি, আরবি ও ইংরেজি শব্দ। বাংলা বিদেশি বিভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে সৃষ্ট মিশ্রভাষা হলেও এই মিশ্রণ সম্পন্ন হয়ে বাংলা একটা পরিপূর্ণ ভাষায় পরিণত হয়েছিল হাজার বছর আগে। প্রায় ৫০০-৭০০ বছর আগে শাহ মুহাম্মদ সগীর, আবদুল হাকিম এবং আলাওলের লেখা রচনাসমূহ এখনো পরিষ্কার বোধগম্য। সুতরাং এখন এই ভাষায় নতুন করে বিদেশি ভাষার শব্দের সরাসরি অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই প্রয়োজনীয় না। কিন্তু অনেকেই কথোপকথনে ইংরেজি শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করছে। আবার বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি না করে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে বাংলাভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করি।

পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের মানুষ এটা মনে করেন না যে, নিজেদের ভাষায় কথা বলার সময় অপ্রয়োজনে ইংরেজি শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করলে ভাষা আরো সমৃদ্ধ ও সহজবোধ্য হয়। জাতীয়তাবাদী চেতনার অভাব এবং হীনম্মন্যতাবোধ থেকে এধরনের চিন্তাভাবনার সৃষ্টি।

অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধানে প্রতিবছর ৬৫০-এর বেশি নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ইংরেজ আমলে অক্সিজেন, সালোক-সংশ্লেষণ, মহাকর্ষ-অভিকর্ষ, বিক্রিয়া—জীব ও পদার্থ বিজ্ঞানের এসব শব্দ ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত, এমনকি ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটার প্রতিশব্দ ‘জাদুঘর’ করা হয়েছিল। সম্প্রতি ইংরেজি ইন্টারনেট শব্দটারও অন্তর্জাল নামে যথার্থ বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করা হয়েছে। এভাবে কারিগরি ও বিজ্ঞানসহ বিদেশি সব শব্দকেই বাংলায় অনুবাদ করা সম্ভব। একটা জাতি যখন নিজেরা নিজেদের ভাষাকে সম্মান করে, তখনই সেই ভাষা সারা পৃথিবীতে মর্যাদা লাভ করে। বাংলাদেশের বাংলাভাষীরা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এক ভাষার জাতি। প্রায় ১.৫ কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে বসবাস করেন। হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ডসহ পৃথিবীর অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো হয়। এমনকি নিউইয়র্ক মেট্রোতেও বাংলায় নির্দেশনা দেওয়া আছে। চেষ্টা করলে বাংলাকে জাতিসংঘের একটা ভাষাতেও পরিণত করা যায়। সংবিধানে দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং সর্বক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটা অমান্য করা হচ্ছে। ভাষার জন্য প্রাণদানকারী জাতির জন্য এসব মোটেও গৌরবের না।  সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের দেশকে উন্নত এবং ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা সম্ভব।

ইত্তেফাক/এএইচপি