বছর তিনেক ধরে সামরিক শাসন চলছে মিয়ানমারে। সব শেষ সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার। মিয়ানমারে মূলত সংকটের শুরু ২০২৩ সালে। দেশ জুড়ে তীব্র্র সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা পুড়িয়ে মারছে এই জনপদকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভোগান্তি। সব মিলিয়ে বৃহত্তর আর্থসামাজিক সমস্যার মুখোমুখি বাংলাদেশের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্র।
জাতিসংঘের আশঙ্কা, নানামুখী সংকট যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছে মিয়ানমারকে, তাতে করে ১৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের মানিবক সহায়তার প্রয়োজন পড়বে অচিরেই। মনে করা হচ্ছে, এই সহায়তার প্রয়োজন পড়বে চলতি বছর, তথা ২০২৪ সালেই।
জানিয়ে রাখতে হয়, এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২৬ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতের শিকার হয়েছে। এর কারণ, তিন তিনটি জাতিগত বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে সামরিক জান্তা সরকার। জান্তা বাহিনীকে টেক্কা দিতে ‘থ্র্রি ব্র্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ নামক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে মিয়ানমারের তিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, তায়াং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি ও আরাকান আর্মি। বলা বাহুল্য, এই তিন বাহিনীর সম্মিলিত শক্তিমত্তার চাপে বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন সামরিক বাহিনীর সরকার। আর এর উত্তাপ বয়ে যাচ্ছে জনজীবনে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানেই ১০টি রাজ্য ও অঞ্চলের ৬ লাখ ৬০ হাজার জনেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যেন কোনোভাবেই পেরে উঠছে না সামরিক বাহিনী। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে গেছে বিদ্রোহীদের কাছে। কিছুদিন আগে জান্তা সরকার সে কথা স্বীকারও করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের ইউনান প্রদেশের সীমান্তবর্তী শান রাজ্যের ‘কৌশলগত শহর’ চিনশ্বেহাওসহ বেশ কয়েকটি শহর হারিয়েছে তারা।
জান্তা সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চীনের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১.৮ বিলিয়ন ডলার। জান্তা সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চিনশ্বেহাও শহর দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে সার পর্যন্ত আমদানি করা হয়। বিভিন্ন যানবাহনও আসে এই সীমান্তপথ দিয়ে। এক কথায়, মায়ানমার-চীন সীমান্ত বাণিজ্যের বেশির ভাগ এই বর্ডার দিয়ে সম্পন্ন হয়। অর্থাত্, মিয়ানমারের জন্য এই বর্ডার হাতছাড়া হওয়ার অর্থ হলো বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জান্তা সরকার বিগত বছরগুলোতে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে কয়েক গুণ। জেনারেল নে উইনের শাসনামলেই মূলত এই সামরিক ব্যয় বেড়েছে। এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে জান্তা সরকার কেবল প্রতিরক্ষা খাতেই ব্যয় করেছে প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মোট ব্যায়ের ১৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় ছিল অনেক কম। যেমন—স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল মোট ব্যয়ের মাত্র ২.৫ শতাংশ। একইভাবে শিক্ষায় ৬.৬ শতাংশ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির জন্য বাজেটের বাইরেও বিপুল অর্থ ব্যয় করে চলেছে জান্তা শাসক। এভাবে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে সামরিক খাতে বাজেট-বহির্ভূত ব্যয় বেড়েছে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন ডলার। দেখা গেছে, সামরিক ব্যয়ের প্রশ্নে ২০২৩ সালে মিয়ানমারে বাজেট-বহির্ভূত ব্যয় ছিল জিডিপির ৪.৯ শতাংশ। এই হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
বর্তমানে মিয়ানমারকে গ্রাস করছে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ছে দেশটির অর্থনৈতিক অঙ্গনে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে ২০২৩ সালের মে মাসে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় মোচার অভিঘাত যুক্ত হয়ে মিয়ানমারকে কাবু করে ফেলেছে। এসবের রেশ বয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনাচরণে। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি পরিবার কাহিল অবস্থায় নিপতিত। এ রকম এক প্রেক্ষাপটে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম আশঙ্কা করছে, ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়বে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি নানা কারণে কৃষি উত্পাদন হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সহজ করে বললে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হবে মিয়ানমারের বিপুলসংখ্যক মানুষ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের মে মাসের ঐ বন্যার কারণে ৩ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাত্, বড় ধরনের বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে মিয়ানমারের জনগণের জীবনে।
মিয়ানমার পেট্রোল, সার, ওষুধসামগ্রী, পাম অয়েল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মার্কিন ডলারের বিপরীতে মিয়ানমার মুদ্রা কিয়াটের দাম ক্রমবর্ধমান হারে পড়তির দিকে। এই সময়ে ২২ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটেছে কিয়াটের। স্থানীয় মুদ্র্রার অবমূল্যায়ন ও মার্কিন ডলারের ঘাটতির কারণে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে হু হু করে। এভাবে চলতে থাকলে মিয়ানমারের জনগণের ভোগান্তি আরো বাড়বে।
বিপত্তি আছে আরো অনেক ক্ষেত্রে। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা এরই মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে স্বাস্থ্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে হাজারেরও বেশি হামলা চালানো হয়। এর ফলে স্বাস্থ্য খাতে কী ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা সহজেই অনুমেয়।
সামরিক দখলদারিত্ব, সংঘাত, অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতের কারণে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এসবের মধ্যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাই বেশি চোখ রাঙাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে, চলতি বছর মিয়ানমারের জিডিপি বাড়তে পারে মাত্র ১ শতাংশ। এর জন্য দায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কিয়াট অবচয়, লজিস্টিক ব্যাঘাত এবং দেশ জুড়ে চলমান সংঘাতের কারণে কৃষি উত্পাদনে ঘাটতি, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে চলমান মন্দা।
উদ্বেগের বিষয়, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংঘাতে আক্রান্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের শান রাজ্যে জ্বালানি, সার ও পরিবহন খরচের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির কারণে মৌলিক জীবিকার প্রশ্নে আফিম চাষ বাড়িয়েছেন বহু কৃষক। ২০২৩ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার দেশটিতে আফিম চাষের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে মিয়ানমার বিশ্বের শীর্ষ আফিম উত্পাদনকারী দেশ হয়ে উঠেছে। বস্তুত, কোভিড-১৯ মহামারি ও সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে আফিম উত্পাদন নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে আফিম উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ৫০৮ মেট্রিকটন। ২০২৩ সালে উত্পাদন বেড়ে ১০৮০ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে।
আফিম উত্পাদনের পাশাপাশি আরেক উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, শান রাজ্যে মিলিশিয়াদের দ্বারা উত্পাদিত মেথামফেটামিন নামক মাদকের অতিবৃদ্ধি, সেই সঙ্গে দেশীয় অন্যান্য মাদকের বিস্তার। এসব মাদকদ্রব্য দেশটিকে যে ব্যাপকভাবে ভোগাবে, তা বোঝাই যাচ্ছে।
সত্যি বলতে, সামরিক জান্তা সরকার যত দিন মিয়ানমারে ক্ষমতায় থাকবে, তত দিন সংকট কেবল বাড়তেই থাকবে। কারণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাতের ফলে দেশের প্রতিরোধব্যবস্থা ক্রমশ ভেঙে পড়বে। বাড়বে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি। অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি রোহিঙ্গা-সংকটের মতো বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুও ভোগাবে নেপিডোকে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এসব সমস্যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ‘উদ্বেগজনক সমস্যা’ হয়ে দাঁড়াতে সময় নেবে না।
লেখক: থাইল্যান্ডের নারেসুয়ান ইউনিভার্সিটির দ্য সেন্টার অব আসিয়ান কমিউনিটি স্টাডিজের গবেষক
ইস্ট এশিয়া ফোরাম থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন
