সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

খেয়ালখুশি ও মিথ্যাচার ছড়াইয়া পড়িয়াছে

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

জগতের চারিদিক যখন মিথ্যার পঙ্গপাল সত্যের নীলাকাশ ঢাকিয়া দেয়, তখন আমাদের চোখে একধরনের ঠুলি পড়ে। যাহারা সত্যসুন্দর নীলাকাশ দেখিয়াছে, তাহাদের নিকট পঙ্গপালঢাকা ধূসর আকাশ বেদনার মতো। তাহাদের তখন কিছু লিখিতে গেলে রুদ্ধ হইয়া আসে হাত, আটকাইয়া আসে কলম কিংবা কম্পিউটারের কি-বোর্ড। তবে যাহারা নীলকাশ দেখে নাই, তাহাদের নিকট ধূসর আকাশই মোহময়; কিন্তু তাহাতে তো নীলাকাশ মিথ্যা হইয়া যায় না। সত্যও হইয়া যায় না ধূসর আকাশ। পৃথিবীর আকাশ যেন ক্রমশ ধূসর হইয়া যাইতেছে। আমরা যেন মধ্যযুগের দিকে ধাবিত হইতেছি, যখন জগত্ ছিল তমসাচ্ছন্ন। আমরা কিছু সুন্দর শব্দ শিখিয়াছি মাত্র। যেমন গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, গুড গভর্নেন্স ইত্যাদি। এই শব্দগুলি শুনিতে ভীষণ ভালো। মনে হয় যেন সত্যের মতো সুন্দর। ঝকঝকে নীলাকাশের মতো স্বচ্ছ; কিন্তু বিশ্ব জুড়িয়া এই শব্দগুলির নামে যাহা চলিতেছে, তাহাকে প্রহসন ছাড়া আর কী বলা যাইতে পারে? অনেকে তাই মনে করেন, মিথ্যা এই গণতন্ত্র, মিথ্যা এই মৌলিক অধিকার, মিথ্যা এই গুড গভর্নেন্স। সেই ‘কতিপয়’ শব্দের মতো এই শব্দগুলি সুন্দর লাগে শুনিতে; কিন্তু সুন্দর লাগিলেও সকল জায়গায় যদি ‘কতিপয়’ বসাইয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে বিপন্ন হয় নিজের পরিচয়। তখন ‘পিতা’ হইয়া যাইতে পারে ‘কতিপয় পিতা’—যেমনটি এক অর্ধশিক্ষিত ছাত্র তাহার পিতাকে লিখিয়াছিল, ‘কতিপয়’ শব্দের মোহে পড়িয়া।

গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, সততা, আইনানুগতা ও দক্ষতা—এই সকল কিছু মিলিয়া হয় গুড গভর্নেন্স। একইভাবে কী কী থাকিলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ঠিক থাকে, তাহা আমরা জানি; কিন্তু তাহা কি আছে? অবস্থা এমন হইয়াছে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি যেন শূন্যের নিচে মাইনাসের দিকে ধাবিত হইতেছে। চারিদিকে ছড়ি ঘুরাইতেছে অর্ধশিক্ষিতের পঙ্গপাল। ইহারাই আবার বুক ফুলাইয়া চলিতেছে। শূন্য কলসি যেমন বাজে অধিক, তেমনি ইহাদের আস্ফাালন ও বাগাড়ম্বরও অধিক। আর এই অবস্থায় যাহারা সত্যদ্রষ্টা-জ্ঞানীগুণী—তাহাদের অবস্থা রাজা ত্রিশঙ্কুর মতো। পুরাণে বলা হইয়াছে, ত্রিশঙ্কু নামে এক রাজা স্বর্গে যাইতে গিয়া আকাশ আর পৃথিবীর মধ্যখানে আটকাইয়া যান। তিনি পৃথিবীতেও আসিতে পারেন না, স্বর্গেও যাইতে পারেন না। রাজা ত্রিশঙ্কুর এই হাল হইতেই তৈরি হইয়াছে বাংলা প্রবচন ‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’। এই অবস্থা হইল ‘অনিশ্চিত অবস্থা’। জগতের বিদ্বজ্জন কর্মবীরদের অবস্থা ঐ ত্রিশঙ্কুর মতো।

বহু রাষ্ট্র ও সমাজ এমন সিস্টেমের প্যাঁচে আটকাইয়া গিয়াছে, যেইখানে মিথ্যা না বলিলে টিকিয়া থাকাটাই মুশকিল। আসলে যেই কাল, যেই জগত্ মিথ্যার বেসাতিতে পরিপূর্ণ হইয়া যায়, সেইখানে মিথ্যা যেন শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার মতো অপরিহার্য হইয়া উঠে। ফলে মিথ্যাও তাহার শিকড় চারিদিকে ছড়াইতে থাকে। চোরের দেশে চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা। মিথ্যার রাজ্যেও তাহাই। মিথ্যা আরো মিথ্যা বাড়ায়, ইহার হাত ধরিয়া দুর্নীতি-অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আসে। সুতরাং ইহা হইল বৃত্তের ভিতরে বৃত্ত। মিথ্যা-চাতুর্য-অসততার চেইন। সেই চেইন ভাঙিতে চেষ্টা করিলে ততদিনে আরো চেইন দানা বাঁধে, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া ধরে সমস্ত অঙ্গ। এই পৃথিবী যেন সেই বৃত্তে আটকাইয়া যাইতেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও অনেক ক্ষেত্রেই সত্য বলিলে সহজে বিশ্বাস হয় না; কিন্তু মিথ্যা বলিলে সহজেই বিশ্বাস হয়। তবে মিথ্যার সহিত সত্য মিশাইয়া বলাটা এই জগতের সবচাইতে ভয়ংকর বিষয়। জার্মান দার্শনিক জিসি লিগেটনবার্গ খানিকটা মিথ্যামিশ্রিত বা খানিকটা বিকৃত সত্যকে আখ্যায়িত করিয়াছেন ‘সবচাইতে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক অসত্য’। সুতরাং পৃথিবীতে চলিতেছে জটিল মিথ্যা-অর্ধমিথ্যা অর্ধসত্যের বিপজ্জনক খেলা, যেইখানে কোনো নিয়ম নাই। খেয়ালখুশির এই পৃথিবী এইভাবে চলিতে পারে না। অতীতে পরিবর্তন আসিয়াছিল। ভবিষ্যতেও আসিবে—ইহা নিশ্চিত।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন